‘মক্কা চুক্তি’ অথবা ইসলামী ন্যাটোতে কী যোগ দেবে বাংলাদেশ !

ফকির ইলিয়াস

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘মক্কা চুক্তি’ অথবা ইসলামী ন্যাটোতে কী যোগ দেবে বাংলাদেশ !

Fakir Ilias

‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে বিশ্বের রাজনীতি এখন সরগরম। তবে কি আরেকটি ‘ইসলামী ন্যাটো হতে যাচ্ছে ? এর সুফল কতটা পেতে পারে বাংলাদেশ ! বাংলাদেশ কি যোগ দেবে মক্কা ডিল বা ইসলামিক ন্যাটোতে? এই প্রশ্ন যখন উঠছে, ঠিক তখনই মুখ খুলেছে ঢাকা। বাংলাদেশ বলছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত মক্কা ডিল বা ইসলামিক ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি দেখছে না। একই সঙ্গে ঢাকার দাবি, এই চুক্তিতে যোগ দিলেও অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বজায় থাকবে। কোনও সমস্যা হবে না।

বিষয়টা নিয়ে কয়েকদিন আগেই মুখ খুলেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি সংসদে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলে ঢাকা বিষয়টি নিয়ে বিবেচনা করবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের’ অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে অন্যদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই।

এরপরেই সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লা জাফর বিন আবিয়াহ-র সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।তিনি বলেন, ‘এটি একটি অনন্য চুক্তি। এটা নতুন সুযোগ তৈরি করছে।’ পাশাপাশি তিনি জানান, এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশে এখনও আলোচনা চলছে।

হুমায়ুন কবির জানান, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ এগোবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখব।’ কিছুদিন আগে, জেদ্দা সফরের সময় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ সহ একাধিক দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন হুমায়ুন কবির। সেই বৈঠকগুলিতে মক্কা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, আলোচনাগুলি ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক।

এই মক্কা চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক।

মক্কা আল-মুকাররমা যৌথ প্রতিরক্ষা সম্মেলনের পর আল-সাফা প্রাসাদে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। এই ডিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, তিন দেশের মধ্যে কোনও একটি দেশের উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এদিকে এই চুক্তি বিষয়ে,বাংলাদেশ ইসলামিক ন্যাটোতে যোগ দেয় কি না, সেই দিকে নজর রেখেছে ভারত। বাংলাদেশের এই অবস্থানের দিকে নজর রাখা হচ্ছে অন্যান্য দেশও। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারতের নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ পাকিস্তান আক্রান্ত হলে, তুরস্ক এবং

সৌদী আরবও আক্রান্ত হবে- এই যোগ বিয়োহ তো ভারতের জন্য ভাবার বিষয় বটেই ! নিউজ আসছে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে তৈরি হচ্ছে সমীকরণ। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট)-তে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ।

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করেছেন, “যে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে।” বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনাও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি যুবরাজ মোহম্মদ বিন সালমনের আমন্ত্রণে তাঁর রিয়াদ সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে ঘিরে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা কাঠামোর ভৌগোলিক পরিসর ভারতের পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এমনিতেই একাধিক বিষয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক মতপার্থক্য সেই সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। ফলে পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ কোনও সামরিক জোটে ঢাকার সম্ভাব্য যোগদান ভারতের কাছে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের জন্য কিছু কৌশলগত সুবিধার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি পোশাক রপ্তানি এবং বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের পাঠানো অর্থের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও আমেরিকা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট সামরিক জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলে বাংলাদেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে ওই অঞ্চলে নোতুন আরেকটি ‘ন্যাটো’ র উ‌ত্থান আমেরিকা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বাংলাদেশ এবং সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান ত্রয়ীর মধ্যে আংশিক জুটিও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। কয়েক দশক ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চল স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। যার ফলে ভারতীয় সেনাকে পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) এবং চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর মনোনিবেশের সুযোগ করে দিয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের পদক্ষেপ সেই ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে। ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভৌগোলিক সংকীর্ণ পথ হল শিলিগুড়ি করিডর। সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এবং যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে এর আটটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদি বাংলাদেশ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জোটবদ্ধ হয়, তবে নয়াদিল্লিকে তার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সম্ভাব্য বিদেশী গোয়েন্দা কার্যকলাপের মোকাবিলা করতে হবে। ত্রিপাক্ষিক চুক্তি কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান পুনরায় শুরু হলে তা শিলিগুড়ি করিডর এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সীমান্ত বরাবর অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে দেশটি কী পাবে এবং বিনিময়ে কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা হারাতে পারে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রস্তাব কী হবে এবং ঢাকা তার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সেটিকে কীভাবে মিলিয়ে দেখবে, তার উপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে। বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে তা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে।
একই সাথে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং চীনের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করার যে কসরত বাংলাদেশ এখন করছে- তা অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Has India Miscalculated Tarique Rahman?

০৫ এপ্রিল ২০২৬

ভয়ানক শংকার পদধ্বনি

২৮ অগাস্ট ২০২৬