হুমায়ূন কবীর ঢালী
০৮ অক্টোবর ২০২৬
Writer Humayun with Tajul Islam
বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাজুল ইমাম একটি সুপরিচিত এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত কবি, ছড়াকার, কথাকার, অনন্য চিত্রশিল্পী, সংগীতজ্ঞ এবং নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক সংগঠক। বহুমাত্রিক এই প্রতিভার অধিকারী মানুষটি দীর্ঘকাল ধরে তাঁর সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে সমাজ, দেশ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে আজকের প্রবাস জীবনের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সুস্থ সংস্কৃতির ধারাকে সমুন্নত রেখেছেন। ৭ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিবস।
১৯৭১ সালে দেশ যখন চরম ক্রান্তিলগ্নের সম্মুখীন, তখন দেশমাতৃকার লক্ষ লক্ষ সূর্যসন্তানের মতো তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। তখন মাত্র সতেরো বছর বয়সের এক কিশোর তাজুল ইমাম। অথচ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ব্যাপারে সচেতন এই তরুণ পরিষ্কার জানতেন ও বুঝতেন দেশে কী ঘটছে। যখন অস্ত্র বোঝাই ‘এমভি সোয়াত’ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে, তখনই তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন কাদের বিরুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহৃত হবে এবং নিজেদের সাধ্যমতো তার প্রতিবাদ করেছিলেন। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে তিনি সপরিবারে চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনিতে পাকিস্তানি বাহিনী এবং প্রতিরোধকারী বাঙালি সেনা ও ইপিআরের গোলাগুলির মাঝে পড়ে যান। পরদিনই তাঁর বাবা পুরো পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তাঁরা ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে ত্রিপুরার মনুতে পৌঁছান। সেখান থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে হরিণা রিক্রুটিং ক্যাম্পে যুদ্ধের জন্য তিনি নাম লেখান এবং ২০ দিন পর বগাফা ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দেন। সেখানে ২১ দিন ধরে স্টেনগান, গ্রেনেড, থ্রি-নট-থ্রি ও রকেট লঞ্চারের মতো হালকা অস্ত্রের নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সময়ের প্রয়োজনে সেদিনের সেই কিশোর অতি অল্প সময়ে মানসিকভাবে এক দায়িত্বশীল পুরুষে রূপান্তরিত হয়েছিল।
ট্রেনিং শেষে অপারেশনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ফটিকছড়ি হয়ে তাঁরা হাটহাজারীতে এসে পৌঁছান। সেখানে বদিউল নামের এক সহযোদ্ধার বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রেখে অপারেশনের প্রস্তুতি নিতেন তাঁরা। নুরুল বর্ষণ নামে তাঁর প্লাটুনেরই এক দক্ষ যোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়া ও সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন, আর তাজুল ইমামের ওপর ন্যস্ত ছিল অপারেশন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব। যুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে তাঁদের মূল অনুপ্রেরণা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাজুল ইমামের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু মানুষের হৃদয়ের অতি গভীরে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন বলেই দীর্ঘদিনের পরাধীন এক জাতি ভেতরের জমাটবদ্ধ ক্রোধকে আশ্রয় করে চরম বিক্রমের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করতে পেরেছিল। এত দক্ষতা ও এত পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাজুল ইমামের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর এই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়। পরাধীনতার শেকল নিজে অনুভব করেছিলেন বলেই স্বাধীনতা তাঁর কাছে এবং প্রতিটি বাঙালির কাছে একটি অমূল্য ধন।
যুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি, বীরত্ব, স্বজন হারানোর বেদনা এবং বিজয়ের আনন্দ তাঁর পরবর্তী জীবনের সমস্ত সৃষ্টিশীল কাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা তাজুল ইমাম চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, জলরঙ, কালি, পেন্সিল, মিক্সড-মিডিয়া এবং ডিজিটাল আর্টসহ বহু মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষ। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ডিজিটাল আর্টের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেন। বর্তমানে গ্রাফিক্স মিডিয়ার সিনিয়র ডিজাইনার এবং শিল্প ও গ্রাফিক্স পরামর্শক হিসেবে কর্মরত এই শিল্পীর ক্যানভাসে নান্দনিক রঙ ও রেখার জাদুতে ফুটে ওঠে মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির রূপান্তর এবং মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা। দেশে ও বিদেশে আয়োজিত তাঁর একক ও যৌথ চিত্র প্রদর্শনীগুলো দর্শক এবং শিল্পসমালোচকদের দ্বারা উচ্চসিত প্রশংসিত হয়েছে।
কাব্য ও সংগীতজগতেও তাজুল ইমাম এক স্বকীয় কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় গভীর জীবনবোধ, মানবিকতা, প্রেম, দ্রোহ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায়। বিশেষ করে, তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ‘সোলস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, আদি প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও গুণী গীতিকার। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে তাঁর লেখা ও সুর করা বেশ কিছু গান শ্রোতাদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে ‘খুঁজিস যাহারে’, ‘এই কীর্তিনাশার তীরে’, ‘কান্দিস কেনে মন পাগিলারে’ এবং ‘শিমুল ফুটেছে, পলাশ ফুটেছে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুরের প্রতি গভীর টান এবং লোকদর্শনের প্রতি অনুরাগের কারণে তাঁর গীতি-কবিতায় বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য ও মাটির আকুতি চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
লেখালেখি, সুরসাধনা ও চিত্রকলার পাশাপাশি তাজুল ইমামের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাস করা এই গুণী মানুষটি প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে বেগবান করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। নিউ ইয়র্কের বুকে নিয়মিত সাহিত্য সভা, কবিতা পাঠের আসর, নাট্যানুষ্ঠান এবং গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করে তিনি প্রবাসে একটি মিনি-বাংলাদেশ গড়ে তুলেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালি ঐতিহ্য, বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে তাঁর এই নিরলস উদ্যোগ সর্বমহলে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তাজুল ইমাম এমন একজন মানুষ যিনি নিজের ভেতরে লালন করেন একটি আস্ত বাংলাদেশ। যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি ছিলেন বীর সেনা, শিল্পের আঙিনায় তিনি তেমনই এক নিবেদিতপ্রাণ রূপকার। তাঁর জীবন ও কাজ তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক অন্তহীন উৎস। শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ তাঁকে বাঙালি সমাজে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে।
জন্মদিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।