বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট ফের চালু হবে কবে?

সাজ্জাদ হোসেন সবুজ

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট ফের চালু হবে কবে?

Biman Flight

ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু হবে কিনা নাকি শুধু আশ্বাস হিসেবেই থেকে যাবে তা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই এই আলোচনা ফের সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং আশা প্রকাশ করছেন এর মাধ্যমে যে দুই দশক আগে ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমানের ফ্লাইট শীঘ্রই আবার চালু হবে।

তারা বলছেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় চার লক্ষ বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং এর প্রায় অর্ধেক লোকই নিউইয়র্ক ও এর আশেপাশে থাকেন। এই সব বাংলাদেশি প্রতি বছর বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করেন।

এর বাইরে বিপুল সংখ্যক দেশি ও বিদেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করেন। সুতরাং তাদের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এই রুটে যত দ্রুত সম্ভব ফের বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালু করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি মূলত সামনে নিয়ে আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া–বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর।

গত ৩০ আগস্ট সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন যে ‘এই সপ্তাহেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অঙ্গীকার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি দারুণ চুক্তি করেছেন’। এতে তিনি বলেছেন, প্রাথমিকভাবে বোয়িংয়ের যত অর্ডার দেওয়া হয়েছিল সেটি উল্লেখযোগ্য বাড়বে।

গরের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত ১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমানকে লেখা এক বার্তায় ট্রাম্প আশ্বস্ত করে বলেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না। একইসঙ্গে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মনোযোগের কথা তিনি সবসময় মনে রাখবেন বলেও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশের সর্বশেষ ফ্লাইটটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অবতরণ করেছিলো ২০০৬ সালে। ১৯৯৩ সাল থেকে সে সময় অবধি ঢাকা-ব্রাসেলস্-নিউইয়র্ক রুটে বিমান চলাচল করতে পারতো। কিন্তু রুটটি বিমান বাংলাদেশের জন্য লাভজনক ছিলোনা। তারপরও বিমান বহুদিন এই পথে লোকসান দিয়ে এই ফ্লাইটটি পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে তার অন্যতম কারণ হলো একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে নতুন স্লট পাওয়া কঠিন হবে।

অবশেষে ব্যাপক লোকসানের কারণে বিমান এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তারপর এই ফ্লাইট পুনরায় চালুর ব্যাপারে গত ২০ বছরে অনেক উদ্যোগ, আশ্বাস ও কথাবার্তা শোনা গেলেও বাস্তবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালাতে হলে বাংলাদেশের বিমানবন্দর ও সিভিল এভিয়েশনকে ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-১ নিরাপত্তা রেটিংয়ে উন্নীত হতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) পরবর্তী সেফটি ও সিকিউরিটি অডিটগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

এই বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করতে পারলে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই এ ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বিমানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ২৬ আগস্ট সচিবালয়ে প্রথম কার্যদিবসে অফিস করতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে উড়োজাহাজের সংকট রয়েছে। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিদ্যমান ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। সংকট কাটাতে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বিষয়ে চুক্তি সই করে পরের বছর থেকে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা অনেকগুলো নতুন ফ্লাইট শুরু করেছি। ভবিষ্যতে নিউইয়র্ক ও সিডনির ফ্লাইট চালু করতে চাই। পাশাপাশি যেসব গন্তব্যে আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ আছে কিন্তু উড়োজাহাজের অভাবে ব্যবহার করতে পারছি না, সেসব রুটেও ফ্লাইট বাড়ানো হবে।

নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, এটি আইকাওর নির্ধারিত মান অর্জনের ওপর নির্ভর করছে। প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করা গেলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিমানবহর সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে দেশে আসবে। তবে তার আগ পর্যন্ত যাত্রীসেবা সচল রাখা ও ফ্লাইট সম্প্রসারণের জন্য লিজে উড়োজাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

মার্কিন থিংক ট্যাংক পিউ রিসার্চ সেন্টার বলেছে আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে (ACS) ডেটা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এককভাবে বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার, যা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ৫৬৯ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে ইউ এস সেন্সাস ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, অন্য পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে বিমানের বহরে যে নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যোগ হতে যাচ্ছে তা দিয়ে ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে ফের বিমান ফ্লাইট চালু করা উচিত এবং এই জন্য দরকার সরকারের আরও আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা।

তারা মনে করছেন যে এই রুটে যদি যথাযথভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করা যায় তাহলে এই রুটটি ঢাকা-টরন্টো বা ঢাকা-লন্ডন রুটের মতো একটি লাভজনক রুটে পরিণত হবে এতে কোন সন্দেহ নাই।

এদিকে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে সরাসরি বিমান ফ্লাইট ফের চালুর জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লক্ষ বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং এর প্রায় অর্ধেক লোক নিউইয়র্ক ও এর আশেপাশে থাকেন। এর বাইরে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কাজে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। সুতরাং তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে অবিলম্বে এই রুটে আবারও বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালু করা উচিত।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Has India Miscalculated Tarique Rahman?

০৫ এপ্রিল ২০২৬

ভয়ানক শংকার পদধ্বনি

২৮ অগাস্ট ২০২৬