সৌদী আরবে বাংলাদেশি জনশক্তির প্রতি অবিচার

ফকির ইলিয়াস

২৩ অক্টোবর ২০২৬

সৌদী আরবে বাংলাদেশি জনশক্তির প্রতি অবিচার

সৌদী আরব ভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে। মক্কা শহরের ক্বার কাছাকাছি প্রত্যেকট বড় বর হোটেল রেস্টুরেন্টের কর্মজীবিরা প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশী। মদিনায় ও একই অবস্থা। বাংলাদেশী শ্রমিকরা খুবই কর্মঠ। পবিত্র হেরেম শরীগে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচ্ছন্নকর্মী বাংলাদেশী। শুধু সৌদীতেই নয়- গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী জনশক্তির সুনাম শিখরে। এটা সত্য যে একজন ইউরোপ-আমেরিকান পাসপোর্টধারীকে সৌদীরা যে চোখে দেখে- অন্যদের তেমনটি দেখে না। এর কারণ কি ? কারণ হচ্ছে পাশ্চাত্যকে মনিব মানে। এই প্রভূ মানার কারণেই বৈষম্য মধ্যপ্রাচ্যে ভমান। অথচ , মহানবী (সাঃ) বলে গিয়েছেন- মানুষ মানুষের প্রভু নয়। সৌদী বা অন্যান্য আরব দেশ কি তা মানছে ? সৌদী আরবে সবচেয়ে লাঞ্চিত বাংলাদেশেে মহিলা শ্রমজীবিরা।

এটা সত্য যে, সৌদি আরবে বিশাল শ্রমবাজারের বিষয় বিবেচনা রেখে বাংলাদেশকে অনেক নমনীয় অবস্থান নিতে হয়। কিন্তু তা কি আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ? একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা দরকার। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে যান ( ছদ্মানাম) কোহিনূর আক্তার। নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪ মাসের মাথায় দেশে ফিরে আসেন কোহিনূর। তিনি মিডিয়াকে বলেন, “শুরুতে আল খারেজে ছিলাম, সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে রিয়াদে চলে আসি। রিয়াদেও এক বাসায় নির্যাতনের শিকার হয়ে আরেক বাসায় আসি। সেখানেও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হই। খাবার দাবারও ঠিক মতো দিতো না। সেখান থেকে একটি অফিসে চাকরি নিই। সেখানেও একই অবস্থা। সেখান থেকে বাঁচার জন্য আমি তিন তলা থেকে ঝাঁপ দিই। পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার ডান পা ও মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। দুই মাস চিকিৎসার পর দূতাবাস আমাকে সেফ হোমে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়।”

দেশে ফেরার পর এই নারীর সংসারও ভেঙে গেছে। একমাত্র সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি। পঙ্গুত্ব নিয়ে তার এখন এক দুর্বিষহ জীবন তার ! ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান মিডিয়াকে বলেছেন, “এরকম আরো শত শত নারী সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকে লাশ হয়ে ফিরেছেন। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে কখনো কথা বলিনি। আমরা তদন্ত করে দেখিনি কেন তাদের এই পরিণতি।” “যেখানে শ্রীলঙ্কা-নেপালের মতো দেশ এই কারণে তাদের নারী কর্মীদের সৌদি আরবে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে আমরা প্রতিবাদটুকুও করছি না। আমরা যেন ফকির মিসকিন,” বলেন তিনি।

তার অভিযোগ, “শতাধিক নারী সৌদি আরবে আত্মহত্যা করেছে। শতাধিক নারীর গায়ে গরম পানি দিয়ে পেড়ানো হয়েছে। আয়রন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। ছাদ থেকে ফেলে দেয়া। যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। সব ধরনের নির্যাতনই হচ্ছে সৌদি আরবে। কিন্ত আমরা এর প্রতিকার করতে পারছি না। প্রতিবাদ করছি না। এক দশকে ১০ হাজার নারী এই ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছে। আমাদের দূতাবাস কি সৌদি পুলিশের কাছে কখনো অভিযোগ করেছে?”

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। আর নারীদের অধিকাংশই যায় সৌদি আরবে। ফিরে আসা নারীদের একটি অংশ নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে।

কী নির্মম পরিহাস আমাদের নারীদের ! তাই সময় এসেছে বিশেষ করে সৌদী আরবে নারী জনশক্তি প্রেরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া। বলা দরকার, মামলা বা ক্ষতিপুরণের ব্যাপারে জানতে চাইলে সৌদি আরবে নির্যাতিতা নারী কোহিনূর আক্তার বলেন, “আমি মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দূতাবাসের লোকজন করতে দেয়নি। বলেছে, তোমাকে তিন তলা থেকে কে লাফ দিতে বলেছে? আর মামলা করলে উল্টো আমার বিরুদ্ধে মামলা হতো। কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো পাঁচ মাসের বেতন না নিয়ে চলে আসতে হয়েছে। আমাকে লেবার কোর্টে গিয়ে বলতে হয়েছে, আমার মালিকের কাছে কোনো বেতন পাওনা নেই। পাওনা চাইলে আমাকে আবার পাঁচ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হতো।”

এই হচ্ছে মুসলিম ‘কফিল’দের বিবাে-বিবেচনা ! কোন ইসলামিক নীতিতে চলছে সৌদী আরব ! সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অন্য এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকারের তরফে বলা হয়েছে, তাদের বিচার এবং রায় কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ মিশন ‘অবগত ছিল না’। বিস্তারিত তথ্যের জন্য সৌদি সরকারকে কূটনৈতিকপত্র দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পাঁচ দিন পর ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর বিন আবিয়াহকে ডেকে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) নজরুল ইসলাম। আগের কূটনৈতিকপত্রের একটি কপি তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। কিন্তু কোনো সঠিক জবাব এখনও পাওয়া যায় নি।

মৃত্যুদণ্ডের ধারায় চলা বিচার এবং রায় কার্যকরের বিষয়ে সৌদি সরকার থেকে বাংলাদেশ মিশনকে ‘না জানানো’ হয়ে থাকলে বিষয়টিকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। সৌদি আরবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে আসা গোলাম মসীহ বলেছেন, “আমার কাছে তো খুব অবাক লাগল যে, এত সিরিয়াস একটা কেইস, আর ডিসিশন তো একদিনেই হয়নি, একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে হয়েছে। ওভার দ্য পিরিয়ড হলে এইটা তো নলেজে অবশ্যই থাকা উচিত ছিল। নলেজের বাইরে কীভাবে গেল? এইটা সম্ভবপর না। আমার সময়ে সবাই তাই দেখেছে, আমার সময় সেটাই হচ্ছিল।”

ওই সময় রিয়াদ ও জেদ্দা মিশনে লেবার উইংয়ের কয়েকজনের সঙ্গে সাত-আটজন আইনি সহায়তাকারী থাকার তথ্য দিয়ে গোলাম মসীহ বলেন, “তারা এগুলা মনিটর করত এবং হয় কনসাল জেনারেল বা রাষ্ট্রদূতকে ব্রিফ করত। ওদের কাজই এটা। ডেইলি তারা কোর্টে যেত, পুলিশ স্টেশনে যেত, তারা খোঁজখবর রাখত। “আমার একটু অবাক লাগে যে এটা কেন তারা, এগুলা তো ইনফর্ম করা হয়। এটা তো গেলেই বোঝা যায় কী কী কেইস আছে, কোথায় কী কেইস আছে। এবং আমি তো মনে করি যে, কোথাও কোনো গ্যাপ আছে” -বলেন তিনি।

তাহলে কথা হলো বাংলাদেশের দূতাবাস সৌদীতে করছে টা কি ? জেদ্দা কনস্যুলেটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা মিডিয়াকে বলেন, যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলা হচ্ছে, তাদের বিচার চলা বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কোনো নোটিফিকেশন, কূটনৈতিক পত্র বা তথ্য দূতাবাসকে কোনো মাধ্যমে দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। কেন দেয় নি ? কারণ সৌদী আরব এই সময়ে বাংলাদেশকে খুব দরকারি রাষ্ট্র বলে বিবেচনা করছে না। কী দুর্ভাগ্যে নিমজ্জিত দেশ আজ !

ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার অ্যাকসেসে বলা আছে, যদি কোনো দেশে অন্য দেশের নাগরিক আটক হয় তাহলে যে দেশে আটক হয়েছে সেই দেশের কাছে কনস্যুলার সুবিধার জন্য অনুরোধ করতে পারে। আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে। এখন সেই সুবিধা বাংলাদেশি দুই নাগরিকও পেতে পারতেন। কিন্তু সৌদীতে বাংলাদেশ দূতাবাস কিছুই করার দরকার মনে করে নি।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিদেশে কর্মরত শতাধিক বাংলাদেশী নারী শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরবে। ২০২১ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসে ৪৯ নারী শ্রমিকের মরদেহ, যেখানে ৯ জন আত্মহত্যা করেন। আর আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে আটজন ছিলেন সৌদি আরবে ও একজন লেবাননে। ২০২২ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এ বছর দেশে ফেরত আসে রেকর্ড ১০৯ নারী শ্রমিকের মরদেহ। এর মধ্যে ৩৪ জন আত্মহত্যা করেন—২৫ জন সৌদি আরবে, ছয়জন জর্ডানে, দুজন ওমানে এবং মালয়েশিয়া ও লেবাননে একজন করে।

দেশে ২০২৩ সালে ফেরত আসে ১০১ নারী শ্রমিকের মরদেহ, যেখানে আত্মহত্যা করে মারা যান ২০ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১৩, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন এবং জর্ডান, ওমান, মালয়েশিয়া ও মৌরিতানিয়ায় একজন করে আত্মহননের পথ বেছে নেন। ২০২৪ সালে দেশে ফেরত আসে ৯৫ নারী শ্রমিকের মরদেহ। এর মধ্যে আত্মহত্যা করে মারা যান ১৫ জন। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ১২ জন সৌদি আরবে, দুজন জর্ডানে ও একজন কাতারে ছিলেন। ২০২৫ এর ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশে মরদেহ এসেছে ৫৮ নারী শ্রমিকের। এর মধ্যে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন। তারা সবাই সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়েছিলেন। ২০২৬ এর পুরো পরিসংখ্যান এখনও অজানা !

আবারও বলি, সৌদী আরবে বাংলাদেশী নারীশ্রমিক পাঠানো চিরতরে বন্ধ করা হোক। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষতা বাড়িয়ে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা দরকার। নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে হলে প্রশিক্ষিত করেই পাঠাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সৌদীরা কোনো মানবিক আইনই মানবে না।

১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো শুরু হয়। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই সময় থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সময়ে নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে দেশটিতে কর্মী পাঠানো বন্ধের আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু এখন তা ভয়াবহ রূপে শুরু হয়েছে।

এটার অবসানে পুরা দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। সৌদী আরব বাঙালী নারীদের জন্য জীবন্ত নরক। ওই নরকে কেন যাবেন বাংলাদেশের নারী শ্রমিকেরা ?

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Has India Miscalculated Tarique Rahman?

০৫ এপ্রিল ২০২৬

ভয়ানক শংকার পদধ্বনি

২৮ অগাস্ট ২০২৬