হুমায়ূন কবীর ঢালী
১৭ অক্টোবর ২০২৬
Humaiun Kabir Dhali
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের জন এফ কে (JFK) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সুশীল সমাজে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিমানবন্দরে উপস্থিত কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁর মুখোমুখি হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তীব্র বাক্যালাপ ছুড়ে দেন। পরবর্তীতে এই ঘটনাকে ‘হেনস্থা’ আখ্যা দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১২ জন সাবেক উপদেষ্টা, একদল বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তবে এই প্রতিবাদ ও উষ্মা প্রকাশ সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের জন্ম দিয়েছে—গত দুই বছর ধরে দেশে যে লাগাতার ‘মব ভায়োলেন্স’, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, লুটপাট, ভাংচুর এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটল, মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেওয়া হলো, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি বত্রিশ নম্বর বোলড্রোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হলো, তখন এই উপদেষ্টারা ও সুশীল সমাজ কোথায় ছিলেন? তখন কেন তাদের কলম সচল দেখা যায়নি, কেন তাদের মুখ থেকে একটিও প্রতিবাদের ভাষা বের হয়নি?
জেএফকে বিমানবন্দরে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ কিছু প্রবাসী তাঁকে ‘দেশ ধ্বংসকারী’ বা ‘শিশু হত্যাকারী’ বলে ডাকছেন এবং তাঁদের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে তাঁর প্রতি কোনো শারীরিক আক্রমণ করা হয়নি—কেউ ডিম ছুঁড়ে মারেনি, পানির ছিটাও দেয়নি, এমনকি গায়ে হাত তোলার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি। আমেরিকা এমন একটি দেশ যেখানে আইন অনুযায়ী নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে বা বাক-স্বাধীনতার আওতায় ক্ষোভ প্রকাশ করা কোনো অপরাধ নয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যেখানে কোনো শারীরিক স্পর্শ বা সহিংসতা ঘটেনি, সেখানে এটাকে আইনগতভাবে কীভাবে ‘হেনস্থা’ বলা চলে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী তারা কেবল তাদের মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দেশে যখন সাধারণ মানুষকে রাস্তাঘাটে বা নিজ বাসভবনে মব জাস্টিসের নামে নির্বিচারে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তখন সেগুলোকে মব জাস্টিস হিসেবে মেনে নিয়ে এই উপদেষ্টারা নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজ বিদেশে কিছু মানুষ বাক-স্বাধীনতা ব্যবহার করে ক্ষোভ প্রকাশ করতেই সেটি ‘হেনস্থা’ বলে চিৎকার করা শুরু হয়েছে।
জনক্ষোভের পটভূমি ও ‘মব কালচার’ :
জনগণের এই ক্ষোভের পেছনে যে সুনির্দিষ্ট কারণগুলো রয়েছে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মহামারী বা স্বাস্থ্যের সংকটের সময়ে যথাসময়ে টিকা বা ওষুধ আমদানিতে গাফিলতির কারণে বহু শিশুর জীবন বিপন্ন হয়েছিল। সরকারি সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে যখন এক হাজারের বেশি শিশু অকালে প্রাণ হারায়, তখন সেই দায় কোনোভাবেই তৎকালীন সরকার ও প্রশাসনিক প্রধানের ওপর থেকে সরে যায় না। ফলে ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকেদের তাঁকে শিশু মৃত্যুর দায় দেওয়া কিংবা শিশু হত্যাকারী হিসেবে অভিহিত করা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এর পাশাপাশি, গত দুই বছরে দেশে ‘মব সন্ত্রাস’-এর যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার দায়ও ড. ইউনূস ও তাঁর সহযোগীদের ওপর বর্তায়। তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উসকানিতে বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অকার্যকর ভূমিকা পালনের কারণে দেশে মব কালচার ছড়িয়ে পড়ে। মবের মাধ্যমে মানুষকে হত্যা করা, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, এমনকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে মাজারে ও কবরে আগুন দেওয়ার মতো বর্বরোচক ঘটনা ঘটেছে। নির্বিচারে মানুষকে মারধর করা এবং গ্রেফতারের ঘটনাগুলো যখন ঘটেছিল, শিক্ষকদের হেনস্থা করা হয়েছিল, তখন এই উপদেষ্টারা ক্ষমতা উপভোগ করছিলেন এবং অপকর্মের নিরব সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। ফলে তখন এসব বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, আর তাদের খারাপ লাগাও কাজ করেনি।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
ক্ষমতায় আসার পর ড. ইউনূসের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সর্বমহলে প্রবল সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ম্যান্ডেট বা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেয়ে তিনি নিজের ও তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতায় বসার পর যেসব সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দেখা যায়—নিজের বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলা দ্রুত প্রত্যাহার এবং বিশাল অঙ্কের কর মওকুফ করা। ‘গ্রামীণ’ নামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তড়িঘড়ি অনুমোদন। গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে জনশক্তি রপ্তানির মতো লাভজনক খাতের লাইসেন্স প্রদান। গ্রামীণ টেলিকমের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা-সংক্রান্ত কোটি টাকার চুক্তি গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া। ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিজের জন্য অতিরিক্ত এক বছরের ভিভিআইপি (VVIP) সুবিধা নিশ্চিত করা।
এসব সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না করে, ব্যক্তিগত মামলা ও গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সুবিধা বৃদ্ধির কাজেই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ড. ইউনূসের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫৬.২৯ মিলিয়ন টাকা। দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় তাঁর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১২.৩ মিলিয়ন টাকা। দেশে যখন অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা, তখন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পদে থাকা ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান তাঁর নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একসময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। দেশের প্রথম ও একমাত্র নোবেলজয়ী হিসেবে পুরো জাতি তাঁকে সম্মানের চোখে দেখত। কিন্তু সম্মান অর্জনের চেয়ে সম্মান রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। ক্ষমতার লিপ্সা, ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আইনের শাসনের অপব্যবহার এবং নিজের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের উন্নতি সাধন করার পর যখন তাঁর এই চেহারা উন্মোচিত হয়েছে, তখন তাঁকে আর আগের জায়গায় বসিয়ে রাখা যায় না।
এখনো সমাজে কিছু মানুষ বা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা অন্ধভাবে ইউনূস পূজায় মগ্ন। তবে এই অন্ধ সমর্থনের মূল কারণ ড. ইউনূসের প্রতি ভালোবাসা নয়; বরং আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি অন্ধ বিরোধিতাই এর প্রধান চালিকাশক্তি। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের বিরোধিতার জায়গা থেকে তারা এমন একজন ব্যক্তিকে ত্রাণকর্তা হিসেবে দাঁড় করাতে চান, যার শাসনকালে দেশজুড়ে নৈরাজ্য, লুটপাট, হত্যা ও অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ঘটেছে।
সবশেষে বলা যায়, বাক-স্বাধীনতা যখন নিজের পক্ষে যায় তখন তা অধিকার, আর নিজের বিরুদ্ধে গেলে তা ‘হেনস্থা’—এমন দ্বিমুখী নীতি সুশীল সমাজের দেউলিয়াত্বকেই ফুটিয়ে তোলে। একজন ব্যক্তিত্ব তাঁর কাজের মাধ্যমেই বিচার্য হন, তাঁর অতীত অর্জনের মাধ্যমে নয়। ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নিজের আখের গোছানো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্যে নীরব থেকে বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রবাসীদের ক্ষোভের মুখে পড়া মূলত তাঁর নিজেরই কাজের পরিণতি। অতীত সম্মানকে জলাঞ্জলি দিয়ে যিনি ব্যক্তিস্বার্থ বেছে নিয়েছেন, ইতিহাস তাঁকে সেই আলোকেই বিচার করবে।