ইরানের খার্গ দ্বীপ নিয়ে মোস্তফা সারওয়ারের একগুচ্ছ কবিতা

মোস্তফা সারওয়ার

১৭ মার্চ ২০২৬

ইরানের খার্গ দ্বীপ নিয়ে মোস্তফা সারওয়ারের একগুচ্ছ কবিতা

Dr. Mostofa Sarwar

কবিতা ১ :

অদৃশ্য পাখির নীল ছাই

রাতের আকাশে

একটা কালো পাখি উড়ে যায়—

তার ডানায় লেগে থাকে

অতীতের নোনা ধুলো,

অচেনা তারার নীল ছাই।

 

খার্গের তটে

ঝিনুকের ভাঙা খোলস

চাঁদের আলোয়

মনে হয় মৃত শহরের হাড়।

দূরে কোথাও

একটি আগুনমন্দিরের ধোঁয়া

ধীরে ধীরে

সমুদ্রের কুয়াশায় মিশে যায়।

 

এই দ্বীপে

গাছেরা দাঁড়িয়ে থাকে

যেন বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া

একটি বনের স্মৃতি—

আর বাতাসে ভেসে আসে

অদৃশ্য কোনো পাখির

দীর্ঘশ্বাস।

 

কবিতা ২ :
গিলগামেশের স্বপ্নে ঘুমিয়ে থাকা মুক্তো

 

দিলমুনের দিকে যাওয়া নৌকারা

এখানে এসে

মিঠে জলের গন্ধে

দু’চোখ ধুয়ে নিত—

যেন স্বর্গের দরজায়

এক মুহূর্তের বিরতি।

 

গিলগামেশের নাবিকেরা

অমরত্বের ঘাস না পেয়ে

তটের বালু থেকে

ঝিনুক কুড়িয়ে নিত;

সেই ঝিনুকের ভেতর

আজও ঘুমিয়ে আছে

একটি অদৃশ্য মুক্তো—

যার আলো

কেউ কোনোদিন দেখেনি।

 

সেলিউসিড যুগের

ভাঙা মৃৎপাত্র

মাটির নিচে

স্বপ্নের মতো পড়ে থাকে—

যেন আলেকজান্ডারের ছায়া

দূর থেকে এসে

এই দ্বীপকে বলেছিল,

“তুমিও একদিন

আমার মানচিত্রে জ্বলবে।”

কবিতা ৩ :

আগুন, ঘণ্টা, আর সাম্রাজ্যের ছায়াদেবতা

 

খ্রিস্টান মঠের ঘণ্টা

ভোরের কুয়াশায় বাজে—

তার পাশে

জোরোয়াস্ত্রের আগুন

নীল হয়ে ওঠে সন্ধ্যায়।

আব্বাসীয় যুগের

বাষট্টি কবর

তারাদের দিকে তাকিয়ে

গুনে যায়

কতবার সাম্রাজ্য বদলেছে।

 

পর্তুগিজ কামানের ধোঁয়া,

ডাচদের ফোর্ট মসেলস্টেইন,

মীর মহান্নার আক্রমণ—

সব মিলিয়ে

দ্বীপটি হয়ে ওঠে

ইতিহাসের ছেঁড়া পতাকা।

 

পাহলভি যুগে

এখানে নির্বাসিত হয়

তুদেহ পার্টির স্বপ্ন—

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে

তারা ভাবত,

“স্বপ্ন কি সত্যিই

মানচিত্রে শুধু

একটি বিন্দু হয়ে থাকে?”

 

ইরান–ইরাক যুদ্ধের আগুন

ডাচ দুর্গ, মঠ, কবর—

সব কাঁপিয়ে দেয়;

তবু ট্যাঙ্কারগুলো

অন্ধকার সমুদ্র চিরে

চলে যায় দূর বন্দরে—

যেন একটি দেশের

হৃদস্পন্দন

এখানেই বেঁচে আছে।

 

এখানে ইতিহাস

একটি ভাঙা কম্পাস—

যার উত্তর-দক্ষিণ

প্রতিটি যুদ্ধের সঙ্গে

পাল্টে যায়।

 

কবিতা ৪ :

মানচিত্রের প্রান্তে জ্বলতে থাকা একাকী দ্বীপ

আলেকজান্ডার কখনও

খার্গের বালিতে পা রাখেনি—

তবু নেয়ারখাসের নৌবহর

যখন উপসাগরের তট ধরে

অজানা দ্বীপ গুনছিল,

খার্গ তখনও

একটি ছোট্ট বিন্দু হয়ে

মানচিত্রের প্রান্তে জ্বলছিল।

 

সেলিউসিড যুগের ভাঙা মৃৎপাত্র

আজও মাটির নিচে

হেলেনিস্টিক স্বপ্নের মতো

ঘুমিয়ে আছে।

 

২০২৬ সালের মার্চে

যখন আবার আগুন নামে—

বলা হয়, সব সামরিক লক্ষ্য

“সম্পূর্ণ ধ্বংস” করা হয়েছে,

কিন্তু তেলের স্থাপনা

অক্ষত রাখা হয়েছে;

দ্বীপ তখন দাঁড়িয়ে থাকে

এক অদ্ভুত দ্বৈততার মধ্যে—

ধ্বংসস্তূপ ও অক্ষত হৃদয়।

 

রাত গভীর হলে

ঝিনুকের খোলস ভেঙে

একটি অদৃশ্য শব্দ ওঠে—

তার ভেতর মিশে থাকে

মুক্তোর ইতিহাস,

নির্বাসনের দীর্ঘশ্বাস,

তেলের গন্ধ,

আর দূর কোনো মঠের

নিঃশব্দ প্রার্থনা।

Facebook Comments Box

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১