আলজেইমার চিকিৎসা-গবেষণায় বিশেষ অ্যাওয়ার্ড পেলেন আলভি খান

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ মে ২০২৬

আলজেইমার চিকিৎসা-গবেষণায় বিশেষ অ্যাওয়ার্ড পেলেন আলভি খান

অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের পর আলভি খানের সাথে ঘনিষ্ঠজনেরা। ছবি-জাগো প্রহরী।

আলজেইমার, পারকিনসন্স এবং ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান আলভি খান তার প্রাথমিক গবেষণায় সাফল্য দেখিয়েছেন। কলেজ গ্র্যাজুয়েশনের সময়েই আলভি খানের গবেষণায় কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্স, জিনোমিক্স এবং সহজে অনুধাবনযোগ্য ওষুধে বিস্তৃত ছিল। আলভি খান জাতীয় সম্মেলনে তার গবেষণা কর্ম সম্পর্কিত প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেছেন এবং ব্যারি গোল্ডওয়াটার স্কলারশিপসহ অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন, যা তাকে বারুক কলেজের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র হিসেবে এই বিশেষ অবস্থানে উন্নীত করেছে। তার গবেষণায় তিনটি স্বাধীন দীগন্ত বিস্তৃত ছিল: মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে সহযোগিতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্নায়ুবিক ভিত্তি খুঁজে দেখা; আলজেইমার রোগে মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন অধ্যয়ন করার জন্য গণনামূলক মডেল তৈরি করা এবং রুমিন্যান্ট হর্ন ডেভেলপমেন্টে স্নায়ু জিনের বিবর্তন অধ্যয়ন করার জন্য তুলনামূলক জিনোমিক্সের ব্যবহার।

Alvi receiving award

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত এসব গবেষণায় বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গত ১৪ মে এক অনুষ্ঠানে বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হয় আলভি খানসহ সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের সেরা ৮ জন মেধাবীকে। আর এটি ঘটে ভার্সিটির ‘জোনাস ই স্যাল্ক স্কলারশিপ’ প্রদানের মধ্য দিয়ে। গবেষণায় বিশেষ সফলতা প্রদর্শনে সক্ষম এই ৮ জনই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিকতর গবেষণার জন্যে মেডিকেল স্কুল অথবা বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম এবং এমডি-পিএইচডি কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞাণে নবঅধ্যায়ের সংযোজনে সক্ষম হবেন এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আলভি খান পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি কলেজের মেডিসিন মেডিক্যাল সায়েন্স ট্রেনিং প্রোগাম (এমএসটিপি)-এ ভর্তি হয়েছেন বায়ো মেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমডি-পিএইচডি সম্পন্ন করতে। এ প্রসঙ্গে আলভি খান এ সংবাদদাতাকে বলেন, আলজেইমার রোগের বিস্তার এবং কীভাবে মানুষের স্মৃতিশক্তিকে বিকল করে দেয়, ক্যালসিয়ামের গতি-প্রকৃতি এবং শেখার কৌশলকে অকার্য করার নেপথ্য পরিক্রমা অনুসন্ধানের পর তা প্রতিরোধের উপায় খুঁজে বের করতে দীর্ঘ গবেষণার কাজটি সম্পন্ন করেছি। এখন আমি পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনে আমার গবেষণার বিষয় পরিবর্তিত করবো নিউরাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। আমি আলজেইমার, পারকিনসন্স এবং ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার ধরন পাল্টে দিতে নতুন কিছুর উদ্ভাবন করতে চাই।

নিউইয়র্কে বসবাসরত পাবনার সন্তান এবং বিশ্ববাংলা টোয়েন্টিফোর টিভির সিইও এবং চেয়ারম্যান আলিম খান আকাশ ও এমডি নুরুন্নাহার খান নিশার বড় ছেলে আলভি খান গবেষণার এই রিপোর্ট সাবমিট করেছিলেন সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের বারুক কলেজে ‘আন্ডার গ্র্যাজুয়েট অনর কমিটি’র নিকট। এটি বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ব্যাচেলর অব সায়েন্স অ্যান্ড বায়োফিজিক্স ডিগ্রির অপরিহার্য একটি পর্ব ছিল বলে প্রতিষ্ঠানটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি চেয়ার অধ্যাপক ড. রামজি খুরি, বায়োলজির সহকারি অধ্যাপক ড. জ্যাকারি কালামারি এক চিঠিতে জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থী-গবেষক আলভি খান এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে সহায়তা করবে। বারুক কলেজের ইতিহাসে প্রথম ‘গোল্ডওয়াটার স্কলার’ হিসেবে গত বছর নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি এখন তাঁর লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন!
‘ব্যারি গোল্ডওয়াটার স্কলারশিপ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘এক্সিলেন্স ইন এডুকেশন ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ উদ্যোগে প্রদত্ত এই বৃত্তিটি সারা দেশের এমন সব মেধাবী শিক্ষার্থীকে স্বীকৃতি জানায়, যারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বিষয়ক গবেষণাধর্মী পেশা গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন। আলভি খান ‘জীববিজ্ঞান’ শাখায় এই বৃত্তিটি অর্জন করেছেন; সে সূত্রে তিনি নিউরোসায়েন্স-কেন্দ্রিক তিনটি গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এর পাশাপাশি ‘মাউন্ট সিনাই হসপিটাল’-এও গবেষণাধর্মী বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।

‘গবেষণার ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ব্যাপক ও গভীর হওয়া সত্ত্বেও আমাকে হাভার্ড এবং ক্যালটেকের মতো স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল,’ বলেন আলভি খান। গত বছরের এপ্রিলে এই স্কলারশিপ পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্তকালে আলভি বলেন, ‘অভাব-অনটনে ঘেরা একটি প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে আসা সত্ত্বে আমি উপলব্ধি করেছি যে, আমার অদম্য অধ্যবসায় এবং যেকোনো পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই আমাকে এই সম্মানজনক পুরস্কারটি এনে দিয়েছে।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ, আলজেইমার রোগ হলো ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ এবং এটি সাধারণত ক্রমবর্ধমান স্মৃতিশক্তির অবনতি, ব্যাপক জ্ঞানীয় অবক্ষয় এবং অবশেষে স্বাধীন কার্যক্ষমতা হারানোর সাথে সম্পর্কিত। যদিও একে সাধারণত অ্যামাইলয়েড-বিটা প্ল্যাক এবং নিউরোফাইব্রিলারি ট্যাঙ্গেল জমা হওয়ার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়, এই প্রধান ক্ষতগুলো নিজে থেকে ব্যাখ্যা করে না যে কীভাবে স্নায়ুতন্ত্র স্মৃতি, শিক্ষা এবং অভিযোজিত আচরণকে সমর্থন করার ক্ষমতা হারায়।

আলজেইমার রোগীরা শেষ পর্যন্ত কেবল টিস্যুর অখন্ডতা নয়, বরং নিউরন, সিন্যাপ্স এবং সার্কিটের কার্যকরীভাবে স্থিতিশীল থাকার ক্ষমতাও হারায়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ খুব সহজে শনাক্তযোগ্য লক্ষণগুলো সিস্টেম এবং আচরণের স্তরে প্রকাশ পায়। রোগীরা সরাসরি প্ল্যাক বা ট্যাঙ্গেল অনুভব করেন না। তারা দিকভ্রান্তি, স্মৃতি গঠনে প্রতিবন্ধকতা, নতুন তথ্য শিখতে অসুবিধা, এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার ক্রমান্বয়িক অবক্ষয়ের মুখে পড়েন। এই ঘাটতিগুলোর অনেকগুলোই মিডিয়াল টেম্পোরাল লোবের কাঠামোর সাথে, বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাসের সাথে সম্পর্কিত, যা এপিসোডিক মেমরি এবং স্থানীয় দিকনির্দেশনায় মুখ্য ভ‚মিকা পালন করে। দিকনির্দেশনা এবং স্থানিক-স্মৃতির প্রতিবন্ধকতা রোগের প্রক্রিয়ার তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই দেখা দিতে পারে, যা ইঙ্গিত করে যে আলজেইমার ডিজিজ শুধু স্থির প্যাথলজির মাধ্যমেই নয়, বরং স্থান, প্রেক্ষাপট এবং অভিজ্ঞতার উপস্থাপনাকে সমর্থনকারী সার্কিটগুলোতে গণনা ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। একই সাথে, এই উচ্চ-স্তরের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে শুধু সার্কিট স্তরে ব্যাখ্যা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে অমীমাংসিত রেখে দেয়।

সার্কিটগুলো ব্যর্থ হয় কারণ সেগুলোকে গঠনকারী কোষগুলো অকার্যকর হয়, এবং কোষগুলো অক্ষম হওয়ায় সংকেত, বিপাক এবং প্লাস্টিসিটিকে সমর্থনকারী আন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়াগুলো অস্থিতিশীল হড়ে পড়ে। নিউরনগুলো একটি নেটওয়ার্কের ভিতরে নিষ্ক্রিয় একক নয়। এগুলো গতিশীল জৈব-রাসায়নিক ব্যবস্থা যার কার্যকারিতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত আন্তঃকোষীয় অবস্থার উপর নির্ভর করে। যদি সেই অবস্থাগুলো ব্যাহত হয়, ব্যাপক কোষ মৃত্যু ঘটার অনেক আগেই সার্কিট গণনা ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই থিসিসটি সেই ধারণা থেকেই শুরু হয়েছে। এটি প্রশ্ন করে যে, একটি একক গণনামূলক কাঠামোর মধ্যে প্রাথমিক আন্তঃকোষীয় দুর্বলতাকে উচ্চতর কার্যকরী দুর্বলতার সাথে সংযুক্ত করা যায় কিনা। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এটি মূলত এই বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে যে হিপোক্যাম্পাল নিউরনে মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্যালসিয়াম-সম্পর্কিত বিশৃঙ্খলাগুলো কোষীয় চাপ থেকে শিখন-সম্পর্কিত আচরণের বৈকল্যের দিকে অগ্রগতির বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করতে পারে কিনা।

আলভি খান তার গবেষণা কর্মের আলোকে একটি বক্তব্যও উপস্থাপন করেন তথ্য-উপাত্তসহ যা সবার মনোযাগ আকর্ষণ করে। এসময় ৬৪ বছর আগে একই স্কলারশিপ পাওয়া বিজ্ঞানী এবং এই স্যাল্ক স্কলার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট আর্নল্ড মেলমেন, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ট্রাস্টি মায়রা লিনারেস-গার্সিয়া, ইউনিভার্সিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর আলিসিয়া আলভের ৮ শিক্ষার্থীর প্রশংসা করেন এবং গভীর মনোযোগে নিজ নিজ গবেষণা কর্মের ধারাবাহিকতা সামনের দিনগুলোতে আরো জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাদেরকে ‘আনসাং হিরো’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

আলভি খানের কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্যে অভিভ‚ত তার মা-বাবাসহ ঘনিষ্ঠজনেরাও। গবেষণায় সাফল্যের অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের অনুষ্ঠানে আরো ছিলেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি ও আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত ‘কাদের মিয়া ফাউন্ডেশন’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল কাদের মিয়া, সন্দ্বীপ পৌরসভা কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জাফরউল্লাহ ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ এর যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসারসহ অনেকে। তারা সকলেই আলভি খানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেছেন।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০