বিশেষ সংবাদদাতা
২৪ এপ্রিল ২০২৬
আইসের গ্রেফতার অভিযান।
ইমিগ্রেশনের ধর-পাকড়ের অভিযানের মধ্যেই রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততার ভুয়া কিংবা মিথ্যা পরিচয়ে অথবা ধর্ম-বর্ণ বিদ্বেষের ভিকটিম হিসেবে আজগুবি ডক্যুমেন্টের মাধ্যমে পাওয়া গ্রিনকার্ড/সিটিজেনশিপ বাতিলের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি পাতানো বিয়ের মাধ্যমে কিংবা নির্যাতিত স্বামী/স্ত্রী হিসেবে প্রাপ্ত গ্রিনকার্ডও বাতিলের ঘটনা ঘটছে। পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো প্রোগ্রামের স্পন্সরকারিদের ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল পরিশোধের পর ভিসা ইস্যুর কথা জানানো হচ্ছে ইন্টারভিউ প্রদানকারিকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষণা কর্মে অথবা দক্ষ কর্মীর সংকট মোকাবেলায় বিদ্যমান ইবি-১, ইবি-২, ইবি-৩ ক্যাটাগরিতে গ্রিনকার্ডের প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশিদেরও খোঁজ চাওয়া হচ্ছে স্পন্সরকারির কাছে। যারা ওইসব ব্যক্তিকে কখনো দেখেননি তারা পড়ছেন জেল-জরিমানার মুখে। কারণ মোটা অর্থের বিনিময়ে ব্যবসায়ী/প্রতিষ্ঠান/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মসূত্রে গ্রিনকার্ডের আবেদন করা হয়েছে, যার সিংহভাগই কখনো কাজে নিয়োজিত নেই।
কখনো জাতীয় পার্টি করেননি অথচ নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর নানা পথে যুক্তরাষ্ট্রে আগত অনেকে জাতীয় পার্টির নির্যাতিত কর্মী হিসেবে এসাইলাম পেয়েছেন। একইভাবে এলডিপির সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক ছিল না-এমন অনেক বাংলাদেশির এসাইলাম সামম্প্রতিক সময়ে মঞ্জুর হয়েছে। এখন হিড়িক পড়েছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী হিসেবে এসাইলাম প্রার্থনার। কয়েক বছর আগেও বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থক হিসেবে মিথ্যা পরিচয়ে গ্রিনকার্ড প্রাপ্তদের অনেকেই এসব সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন না। এমন অসৎ পথে পাওয়া গ্রিনকার্ড এখন ঝুঁকির মুখে। ইতিমধ্যেই যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়েছিলেন তারা গ্রিনকার্ড খুইয়েছেন কিংবা চরমপত্র হাতে এয়ারপোর্ট অতিক্রমে সক্ষম হয়েই অ্যাটর্নির শরণাপন্ন হয়েছেন। ভাওয়ার (ভায়োলেঞ্চ এগেইনস্ট উইমেন অ্যাক্ট) আওতায় গ্রিনকার্ডের এক আবেদনকারি নিউইয়র্কের এক ভ‚য়া প্যারালিগ্যালের পরামর্শে মোটা অংকের ফি দিয়ে ট্র্যাভেল ডক্যুমেন্ট নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় জেএফকে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের এজেন্টরা তাকে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠিয়েছেন। ওই একই ব্যক্তির পরামর্শে মোটা ফি দিয়ে এসাইলামের আবেদন পেন্ডিং থাকা এক প্রবাসী বাংলাদেশে গিয়ে ফেরার সময় আম-ছালা সব হারিয়েছেন।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ গ্রহণকারির ৫৬% বাংলাদেশি ফেডারেল সরকারের পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা নিচ্ছেন এবং এ তথ্য প্রকাশের পরই পারিবারিক কোটায় যুক্তরাষ্ট্রে আসতে আগ্রহীরা পড়েছেন মহাবিপাকে। তাদের জন্য যারা স্পন্সর করেছেন তাদের আর্থিক সামর্থ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর এ কাজটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইন্টারভিউ প্রদানের পরও ভিসার সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এমন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন শুধু বাংলাদেশিরাই নন, ৭২ দেশের নাগরিকেরা নিপতিত হয়েছন। এ ধরনের নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে ফেডারেল কোর্টে। এখনো শুনানির তারিখ জানা যায়নি।
ইউএসসিআইএস’র সাথে প্রতারণাকারিদের শনাক্ত এবং গ্রিনকার্ড কেড়ে নিয়ে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ার এ অভিযানে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে আরো কয়েকটি সংস্থাকে যুক্ত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর সহযোগিতাও নেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় গোটা কমিউনিটি সন্ত্রস্ত। ইমিগ্রেশনের সাথে প্রতারণাকারিদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিধিগুলো নতুন নয়। তবে অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা হয়নি। কিন্তু নির্বাচনী অঙ্গিকার অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসন প্রতারকদের ছাড় দিতে নারাজ। শুধু বাংলাদেশিরাই নন, স্প্যানিশ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকানরা এই অভিযানের টার্গেট বলে জানা গেছে।
ইতিমধ্যেই ইবি-১, ইবি-২ এবং ইবি-৩ ক্যাটাগরিতে স্পন্সরকারিদের অনেকেই চিঠি পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে কখনোই কাজ করেননি এমন ব্যক্তিদের জন্যে কেন মিথ্যা অঙ্গিকারনামা করা হয়েছে সেটির ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও জালিয়াতি করেছেন সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। এই ক্যাটাগরির কর্মীদের কাছে কোনো ধরনের ফির বাহানায় নগদ অর্থ গ্রহণ করাটা বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ জেনেও অনেকে তা করে এখন নিজের সবকিছু খোয়ানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া ব্যবসা কিংবা অফিস খোলে অনেক প্রবাসী বহু মানুষকে স্পন্সর করেছেন। কেউ কেউ গণমাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা অথবা বিলাসবহুল পার্টি হলে নানা প্রতিযোগিতার স্পন্সর অথবা হোস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তার নেপথ্যেও পাওয়া যাচ্ছে শতশত মানুষের কাছে লাখ লাখ ডলার নিয়ে এই ক্যাটাগরির আওতায় গ্রিনকার্ডের আবেদন করার তথ্য। ঢাল নেই তরোয়াল নেই এমন কতিপয় ব্যক্তিকেও বিশাল ব্যবসায়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায়, কাউকে কাউকে সিটি মেয়র, স্টেট গভর্নর কিংবা সিনেটর-কংগ্রেসম্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ছবিতে পোজ দিতেও দেখা যাচ্ছে। নিজের ওয়ার্ক পারমিট পর্যন্ত নেই তেমন কিছু মানুষও বেসমেন্ট ভাড়া নিয়ে কিংবা ভ‚য়া ঠিকানায় ডজনখানেক কর্পোরেশন দেখিয়ে এই ক্যাটাগরিতে স্পন্সরশিপের ধান্দা করেছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ পেয়েছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদদাতার কথা হয় নিউইয়র্কের খ্যাতনামা অ্যাটর্নি এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশনের পরিচালক মঈন চৌধুরীর সাথে। ২৩ এপ্রিল তিনি এ সংবাদদাতাকে জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান অভিযানে গোটা কমিউনিটি সন্ত্রস্ত। এ সুযোগে কিছু লোক নিজেকে আইনি পরামর্শক হিসেবে দাবি করে সহজ-সরল প্রবাসীদের বিপদে ঠেলে দিচ্ছেন। ইমিগ্রেশনে যে কোনো ক্যাটাগরিতে আবেদনকারিরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গেলে সংকটে/ঝামেলায় পড়বেন-এটাই স্বাভাবিক। এতদসত্বেও অভিজ্ঞ অ্যাটর্নির শরনাপন্ন না হয়ে অনেকে কথিত পরামর্শকের (প্যারালিগ্যাল) খপ্পরে পড়ছেন। সময়টি খুবই জটিল, তাই সকলেরই উচিত সতর্কতা অবলম্বন করা। এমনকি যারা মিথ্যা পরিচয়ে গ্রিনকার্ডের পথ বেয়ে সিটিজেন হয়েছেন-তারাও এখন নিরাপদ নন। কর্তৃপক্ষ ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধানে নেমেছে দুষ্ট লোকদের গ্রিনকার্ড বাতিল এবং সিটিজেনশিপ কেড়ে নিতে। ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দ নয় এমন জাতি-গোষ্ঠি মূলত টার্গেট বলে মনে হচ্ছে সাম্প্রতিক নানা অভিযানে। তাই সবার উচিত খুবই সতর্কতার সাথে চলাচলের।