‘দ্য ইউনিভার্সাল পাথ অ্যান্ড দ্য আনকন্সাস ট্র্যাভেলার’

শুধু গান নয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত মানবজীবনের অন্তর্গত কাঠামোর ধারাবিবরণী

সাইফুল সিদ্দিক

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শুধু গান নয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত মানবজীবনের অন্তর্গত কাঠামোর ধারাবিবরণী

বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি-জাগো প্রহরী।

‘রবীন্দ্রসংগীতে সার্বজনীন পথ ও অবচেতন পথিক’ বইয়ের লেখক আদিতি আদিয়া জানান, এই বই শুরু হয়েছিল এক বিস্ময়ের মুহ‚র্ত দিয়ে। আমি একটি পরিচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান শুনছিলাম, যখন হঠাৎ বুঝতে পারলাম এটি কেবল সুর বা গান নয়, এটি মানুষের জীবনের অন্তর্গত কাঠামো বর্ণনা করছে।
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে/
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ/
তব ভুবনে তব ভবনে/
আরো আলো আরো আলো/
এই নয়নে, প্রভু, ঢালো।

লেখক জানান, এই বই রবীন্দ্রনাথকে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে বিশ্লেষণ করে না। তাঁর জীবনী বা সমগ্র সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণের চেষ্টা করে না। বরং এটি তাঁর গানগুলোর দিকে তাকায় এবং একটি সহজ প্রশ্ন করে: এই গানগুলোতে কি মানবচেতনা সম্পর্কে কোনো গোপন বার্তা আছে? বহু বছরের পাঠ ও মনোযোগ দিয়ে শোনার পর আমার উত্তর হয়েছে, আছে। রবীন্দ্রনাথের গান, সুর ও আবেগের সৌন্দর্যের জন্য সবার প্রিয়। কিন্তু যখন আমি গানের কথা গভীরভাবে পড়তে শুরু করি, দেখি একই ধারণা, প্রতীক ও শব্দ বারবার ফিরে আসে। “তুমি”, “আমি”, “বসন্ত”, “পথ”, “মেঘ”, “আলো”, “ঘর”, “সুদূর” -এগুলো এলোমেলো গানের কথা নয়। এগুলো একটি প্যাটার্নের অংশ। ধীরে ধীরে বুঝলাম গানগুলো মানুষের মানসিক‑শারীরিক যাত্রার একটি মানচিত্র তৈরি করছে। এই বই সেই মানচিত্র উপস্থাপন করে।

লেখক এ সংবাদদাতার কাছে আরো বলেন, আমি একে বলি সার্বজনীন চেতনা মডেল (চিত্র)। এটি একটি কাঠামো যা ব্যাখ্যা করে মানুষের ভেতরে থাকা দুই শক্তিকে-অবচেতন “তুমি” এবং সচেতন “আমি” এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও জীবনের উপর প্রভাবকে, “তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা”। এই মডেল অনুযায়ী আমরা জন্মাই একটি স্বাভাবিক সচেতন সত্তা নিয়ে। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে আরেকটি শক্তি নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, মনচালিত অবচেতন সত্তা। এটি আমাদের ইচ্ছা, ভয়, সামাজিক পরিচয় এবং আত্মভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা বুঝতেই পারি না যে জীবনের বেশিরভাগ সময় এই অবচেতন শক্তির নিয়ন্ত্রণে কাটাই।
‘রবীন্দ্রসংগীত বারবার এই সংগ্রামের কথা বলে। যা প্রেমের গান বলে মনে হয়, তা আসলে অন্তর্দ্ব›েদ্বর কথা বলে। যা উপাসনার গান বলে মনে হয়, তা নিজের অবচেতনের সাথে সংলাপ। যা প্রকৃতির গান মনে হয়, তা মানুষের জীবনের ধাপগুলোর বর্ণনা’, মন্তব্য আদিতির।

বইটিতে ১১৭টি গানের বিশ্লেষণ ছাড়াও ৭০টির বিস্তারিত অনুবাদ রয়েছে। ‘গানগুলোর প্রতীকগুলোকে বিভিন্ন বিভাগে সাজিয়েছি-মানসিক অবস্থা, ঋতু, মহাজাগতিক উপাদান, সময়, বাসস্থান এবং দেখিয়েছি কীভাবে এগুলো একই কাঠামোকে সমর্থন করে। এই গানগুলো একসাথে অবচেতন জীবনের চার ধাপের একটি যাত্রা বর্ণনা করে। শৈশব উজ্জ্বল সূচনা, পরিণত বয়সে বিভ্রান্তি, এবং শেষে এক মোড়- “ফিরে না আসার বিন্দু” -যেখানে মানুষ হয় একই পুনরাবৃত্তিতে আটকে থাকে, নয়তো সচেতন জাগরণে পৌঁছায়’, বলেন আদিতি। ‘রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বসন্ত মানে জাগরণের সময় এসেছে। বসন্ত শুধু ঋতু নয়, উপলব্ধির প্রতীক। মুক্তি মানে পৃথিবী থেকে পালানো নয় বরং নিজের অবচেতন জীবনকে চিনে নেওয়া। এটি ধর্মীয় মতবাদ নয়, মানসিক জাগরণ। এই বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো-রবীন্দ্রনাথ তাঁর বার্তাকে চোখের সামনেই লুকিয়ে রেখেছেন। সুরের সৌন্দর্য অর্থকে আড়াল করে দেয়।’

আদিতি বলেন, গানের গঠন জীবনের মতো-উপরে সুর ও মাদকতা, নিচে সত্য ও সংগ্রাম। আমার পদ্ধতিতে অনুবাদ, প্রতীক বিশ্লেষণ ও চিত্রভিত্তিক মডেল ব্যবহার করেছি। পাঠক যখন এই প্যাটার্ন চিনতে শেখে, নতুন গানও একই কাঠামোয় মিলে যায়। এই বই বিশ্বাস চাপিয়ে দেয় না। এটি অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ। আমি ইংরেজি ও বাংলা-দুই ভাষাই ব্যবহার করেছি, কারণ অনেক অর্থ অনুবাদে হারিয়ে যায়। দ্বিভাষিক পদ্ধতি মূল গভীরতা ধরে রাখে। শেষ পর্যন্ত এই বই শুধু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নয়, আমাদের সম্পর্কে। আমরা সবাই অবচেতন জীবনের চক্রের মধ্যে দিয়ে যাই। তাঁর গান আমাদের ভেতরের অবচেতন পথিককে আয়নার মতো দেখায়। এই বইয়ের উদ্দেশ্য হলো ধীরে শোনা শেখানো। গানকে শুধু সাংস্কৃতিক সম্পদ নয়, আত্ম-উপলব্ধির দার্শনিক পাঠ হিসেবে দেখা।

আদিতি মনে করেন, বোঝাপড়া সৌন্দর্য কমায় না-বরং গভীর করে। সার্বজনীন পথ তৈরি করা নয়, এটি আমাদেও স্মৃতিতে আগে থেকেই আছে। বইটি শুধু সেটিকে মনে করিয়ে দেয়। ফ্রি কপি ওয়েবসাইট এ পাওয়া যাবে। হার্ডকপি কিনতে হলে আমাজনে খোঁজ করুন https://theunconscioustraveler.com/

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদিতি আদিয়া লেখকের ছদ্মনাম। প্রকৃত নাম হচ্ছে গোলাম মোস্তফা। মিশিগানে বসবাসরত সমাজ-সভ্যতার ওপর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারি বাংলাদেশি আমেরিকান গোলাম মোস্তফা তথা ‘আদিতি আদিয়া’ শব্দবন্ধটি দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত, যার অর্থ যথাক্রমে “তুলনাহীন” এবং “আদি”। একসাথে এরা এমন এক রূপান্তরের প্রতীক, যেখানে “অদ্বিতীয়” অবস্থা থেকে “শুরু” বা “সূর্যের আলো”কে গ্রহণ করা বোঝায়। এটি একটি পরিচয় নয়, বরং নিজের অবস্থার এক পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই বইয়ের বিষয়বস্তু এতটাই স্বতন্ত্র যে মানুষের তৈরি কোনো শিক্ষা বা যোগ্যতা এর রচয়িতা হওয়ার দাবি করতে পারে না। তবুও লেখক এর কারণে কোনো ঐশ্বরিকতা বা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করেন না। বরং এটি এমন এক অবস্থাকে ধারণ করে, যেখানে সবার সচেতনভাবে অবস্থান করা উচিত, কারও সহায়তা ছাড়াই। এটি বোঝার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই, আবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাউকে এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতও করতে পারে না। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই এই যাত্রা গোপনে লিপিবদ্ধ আছে। আমাদের কাজ হলো এই সচেতনতা স্বীকার করা এবং পুনরুজ্জীবিত করা।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Default Advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১