আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন: ট্রাইব্যুনালে লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষোভ

ঢাকা সংবাদদাতা

৩১ জুলাই ২০২৬

আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন: ট্রাইব্যুনালে লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষোভ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কথা বলার অনুমতি না পাওয়ায় এবং পুলিশের আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, “আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন। আমার মৃত্যুতে সহায়তা করুন। এই আদালত পক্ষপাতদুষ্ট।”

বুধবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করা লতিফ সিদ্দিকীকে বৃহস্পতিবার দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

আসামিপক্ষে কোনো জামিনের আবেদন না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে তাকে শাপলা চত্বরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২।

শুনানি চলাকালে এজলাসের কাচঘেরা ডকে থাকা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে লতিফ সিদ্দিকী দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আককর্ষণ করার চেষ্টা করেন। অন্তত চারবার তাকে বলতে শোনা যায়, “মাননীয় আদালত আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “উনি কে, তাকে কে অ্যালাও করেছে? আসক হিম টু স্টপ।”

তখন লতিফ সিদ্দিকীকে বলতে শোনা যায়, “এই যদি হয় আদালত, আমি কোথায় যাব!” এরপর ট্রাইব্যুনাল উঠে গেলে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য ডকে দাঁড়িয়ে থাকা লতিফ সিদ্দিকীকে বসতে বলেন। তখন ওই পুলিশ সদস্যকে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি বসে থাকব না দাঁড়িয়ে থাকব, সেটা আমার ব্যপার।”

তখন ওই পুলিশ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীকে ধাক্কা দিয়ে ডকের ভেতরের দিকে ঠেলে দেন। লতিফ সিদ্দিকীর আইনজীবীরা তখন ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ‘গায়ে হাত তোলার’ অভিযোগ করেন। এ পর্যায়ে লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কাদের সিদ্দিকী এসে পরিস্থিতি সামাল দেন।

এরপর ডক থেকে নামিয়ে নেওয়ার সময় লতিফ সিদ্দিকীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন।”

হাতকড়া পরিয়ে লতিফ সিদ্দকীকে ডক থেকে নামিয়ে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শুনানির বিষয়ে ব্রিফ করতে এলে সাংবাদিকরা তাকে এজলাসের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন।

লতিফ সিদ্দিকীকে কথা বলতে না দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রসিকিউটর বলেন, “আসামির আইনজীবী ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেছিলেন যে তিনি কথা বলতে চান। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ‘আজকে কথা আমরা শুনতে পারছি না, সামনের ধার্য তারিখে আপনার কথা শুনব’।”

পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মিজানুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনেছেন এবং দেখে মন্তব্য করবেন।

লতিফ সিদ্দিকী আদালতে নিজের ফাঁসি চেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নে প্রসিকিউটর বলেন, “উনি কিছু কথা বলেছেন, আমার কানে ঢোকে নাই।”

এদিকে আদালতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকীকেও বিভিন্ন প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।

একজন সাংবাদিক বলেন, “কোর্টের ভেতরে আমরা দেখলাম যে, পুলিশ যারা এখানে দায়িত্বে আছেন তাদের সাথে আপনার ভাইয়ের বাকবিতণ্ডা হচ্ছিল এবং উনি কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণও করছিলেন। কী হয়েছিল ঘটনাটা একটু বলবেন?”

কাদের সিদ্দিকী তখন বলেন, “আসলে প্রত্যেক অভিযুক্ত, তিনি কথা বলতে পারেন। তাকে যেহেতু কোর্টে এনেছে, তার কথা বলার অধিকার আছে। তিনি সেই কথাই বলতে চেয়েছিলেন।

“গতরাতে তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তাদের যে সুন্দর ব্যবহার দেখছি, এখানে তার বিপরীত একেবারে অসুন্দর ব্যবহার। আমার গায়েও ধাক্কা লেগেছে।”

তিনি বলেন, “লতিফ সিদ্দিকী, ৮৭ বছর বয়স যার, এই বাংলাদেশের জন্মের বেদনার সাথে তিনি জড়িত। ঠিক আছে, আমি মুক্তিযুদ্ধে একটা বিরাট সুনাম অর্জন করেছিলাম। কিন্তু তারও সূচনা করেছিলেন এই লতিফ সিদ্দিকী।

“লতিফ সিদ্দিকী না হলে আমি একজন রিকশাচালক হতাম, অথবা গরুর রাখাল হতাম। আমি মনে করি সম্মানী ব্যক্তিদের সম্মান দেওয়া উচিত।”

ট্রাইব্যুনালে শুনানি শেষে লতিফ সিদ্দিকী কেন নিজের ফাঁসি চাইছিলেন, সে বিষয়েও তার ভাইয়ের কাছে জানতে চান একজন সাংবাদিক।

জবাবে তিনি বলেন, “আমি এ কথাটা স্পষ্ট করেই বলব। মানুষ বাঁচে কদিন? উনার ৮৭ হয়ে গেছে, আমার ৮০ হয়ে গেছে। এখন যদি উনি কোনো অপরাধের দায়ে—যে অপরাধটা তিনি করেন নাই, তার ফাঁসি হয়, আমরা সাদরে গ্রহণ করব। কারণ আল্লাহ তায়ালা তাকে তখন মুক্তি দেবেন, আল্লাহ নিজেই বলেছেন।”

আরেক সাংবাদিক একই বিষয়ে প্রশ্ন করলে কাদের সিদ্দিকী বলেন, “বিনা অপরাধে যদি তার ফাঁসি হয়, তাহলে তো দুনিয়ায় যে ভুলত্রুটি করেছেন সেগুলো থেকে তিনি মাফ পাবেন। আমরাও সেটা চাই।”

তবে লতিফ সিদ্দিকীকে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছেন না সাবেক এমপি কাদের সিদ্দিকী।

পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ইংগিত করে তিনি বলেন, “আমার হ্যান্ডকাফ নিয়ে কোনো ব্যাপার নাই। এটা সরকার বুঝবে। আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ বহুবার পড়েছে। হ্যান্ডকাফকে আমরা খুব একটা খারাপ কিছু মনে করি না। বিবাহের সময় মেয়েদের হাতে যেমন চুড়ি দেওয়া হয়, আমরা ওরকমই মনে করি।”

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১