জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও উপড়ে ফেলা হলো অর্ধশতাধিক গাছ

ডেস্ক রিপোর্ট

০৪ জুলাই ২০২৫

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও উপড়ে ফেলা হলো অর্ধশতাধিক গাছ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের জন্য সেগুন, কাঁঠালসহ অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের সম্প্রসারিত ভবন নির্মাণের জন্য অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। আজ সোমবার সকালে এক্সকাভেটর (মাটি খননের যন্ত্র) দিয়ে গাছগুলো উপড়ে ফেলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন।

আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনের গাছ উপড়ে ফেলতে শুরু করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। এ সময় সেখানে ভবন নির্মাণের সমর্থক গণিত বিভাগের একদল শিক্ষার্থী ছিলেন।

এদিকে গাছ কাটার খবর পেয়ে সেখানে যান ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, ছাত্র ফ্রন্ট ও সাংস্কৃতিক জোটের নেতা–কর্মীরা। তাঁরা গাছ কাটার প্রতিবাদ জানান।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান ও অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নাসির উদ্দীনসহ কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে তাঁরা জানান, কার অনুমতি নিয়ে গাছ কাটা হয়েছে, তা তাঁরা জানেন না। পরে উপাচার্যের নির্দেশে গাছ উপড়ে ফেলা বন্ধ করা হয়। এর আগেই অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে ফেলা হয়।

এ সময় উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত হয়েছিল যাঁরা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের টেন্ডার পাবেন, তাঁদের পরামর্শক্রমে জায়গা নির্ধারণ করে ভবন নির্মাণ করা হবে। কারণ, ভবন দরকার, সঙ্গে পরিবেশও রক্ষা করতে হবে। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে গাছ উপড়ে ফেলা হলো। বিষয়টা জানার জন্য আজ প্রশাসনিক সভা করব।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ এপ্রিল পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে ভবন নির্মাণের জন্য টিনের বেড়া দিয়ে গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন না করে ভবন নির্মাণে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে বিষয়টি স্থগিত করা হয়। সম্প্রতি উপাচার্য শিক্ষার্থীদের জানিয়েছিলেন, মাস্টারপ্ল্যান দরপত্র আহ্বান করা হবে। তাঁদের পরামর্শক্রমে ভবন নির্মাণের স্থান নির্ধারিত হবে। তখন গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের ভবন নির্মাণ করা হবে। তবে এর আগেই গাছগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে।
আজ দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে আছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সেগুনগাছ। এ ছাড়া কাঁঠালগাছ রয়েছে কয়েকটি।

গাছগুলো উপড়ে ফেলেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্সের কর্মীরা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আবু রুম্মান (গণিত ছাত্র সংসদের ভিপি) আমাকে ফোন করে জানান, সব ঝামেলা মিটে গেছে, আপনি লোকবল পাঠিয়ে কাজ শুরু করেন। সে অনুযায়ী আজ আমি লোকবল পাঠিয়েছিলাম।’ শিক্ষক বা উপাচার্যের সঙ্গে কথা না বলে সেখানে কাজ শুরু করা তাঁদের ঠিক হয়নি বলে স্বীকার করেন আবদুল আজিজ।

এ বিষয়ে আবু রুম্মান বলেন, ‘আমরা প্রথমত গাছ কাটার বিপক্ষে। তবে আমাদের বিভাগের শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব–সংকট, শিক্ষকদের বসার জায়গা নেই, আমাদের চলাচলেরও জায়গা নেই। আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম গতিশীল রাখতে ভবন দরকার। সেই জায়গা থেকে পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি করে হলেও আমাদের ভবন দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ১০ তলাবিশিষ্ট ছয়টি নতুন হল নির্মাণ করা শেষ। এসব স্থাপনা করতে গিয়ে কয়েক হাজারের বেশি গাছ কাটা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানালেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি।

এ সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সজীব আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যেই পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। এটা প্রজেক্টের পিডি জানেন না, উপাচার্যও জানেন না। আমরা আসলে জানতে চাই, এই গাছগুলো কে কাটল? কার হুকুম নিয়ে কাটা হলো? যদি উপাচার্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেন, তাহলে আমরা মামলা করব, আদালতে যাব।’

গাছ উপড়ে ফেলার প্রতিবাদে আজ বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা

গাছ উপড়ে ফেলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ

গাছ উপড়ে ফেলার প্রতিবাদে আজ বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিকেল পৌনে চারটার দিকে ‘জাহাঙ্গীরনগর বাঁচাও আন্দোলন’–এর ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে মিছিল বের করেন তাঁরা। এটি কয়েকটি সড়ক ঘুরে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সামনে (যেখানে গাছগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে) গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানেই সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তাঁরা।

মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘পাখির বাসা ধ্বংস করে উন্নয়ন চাই না’, ‘প্রাণ-প্রকৃতি ধংস করে উন্নয়ন চাই না’, ‘জলাভূমি ধ্বংস করে উন্নয়ন চাই না’, ‘যেই ভিসি গাছ কাটে, সেই ভিসি চাই না’, ‘মাস্টারপ্ল্যান দিয়ে দাও, নইলে গদি ছাইড়া দাও’, ‘অবিলম্বে মাস্টারপ্ল্যান দিতে হবে, দিতে হবে’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নূর-এ তামিম বলেন, ‘গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের আশা ছিল, নতুন যে প্রশাসন আসবে, সেই প্রশাসন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম যে প্রয়োজন একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান, ন্যূনতম আবাসিক মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করবে। অভ্যুত্থান–পরবর্তী প্রশাসনকে আমরা একরাশ আশা নিয়ে দফায় দফায়, অসংখ্য চিঠি দিয়েছি। কিন্তু আমাদের চিঠিকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। আইবিএ ভবনের গাছ কাটার সময় সাবেক ভিসিও বলেছিলেন তিনি জানেন না। বর্তমান ভিসি তখন বলেছিলেন, “ক্যাম্পাসে যদি একটা গাছের পাতাও পড়ে, সেটি ভিসির অগোচরে পড়তে পারে না।”’

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বনিপদের দেখা পেলাম

০৪ জুলাই ২০২৫

Default Advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১