আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ জানুয়ারি ২০২৬
Trump and Greenland
মার্কিন প্রেসিডন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে ডেনমার্কের অধীন স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ইস্যুতে একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তিনি নিশ্চিত করেছেন—যার মধ্যে দ্বীপ রাষ্ট্রটির বিরল খনিজ সম্পদের ওপর অধিকারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, গ্রিনল্যান্ডে আসলে কী ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে? ধারণা করা হয়, গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স, সবুজ জ্বালানি এবং বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বিশাল ভাণ্ডারও সেখানে আছে; যেগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ট্রাম্প আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে ‘ক্রিটিক্যাল ম্যাটেরিয়ালস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাফাইট, নাইওবিয়াম ও টাইটানিয়াম। ২০২৩ সালের ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব ‘শুধু প্রতিরক্ষা বিষয়ক নয়’—গত বছর গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে সিনেটের এক শুনানিতে এমন মন্তব্য করেন টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ।
তিনি দ্বীপটির ‘বিরাট বিরল খনিজ উপাদানের মজুতের’ কথাও তুলে ধরেন।
তবে ট্রাম্প কখনো কখনো এসব সম্পদের গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, মূল বিষয় হলো ওই অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বাড়ছে—যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড ‘অবশ্যই দরকার’।
গত ২১ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি গ্রিনল্যান্ড চাই নিরাপত্তার জন্য—অন্য কোনো কারণে নয়।’ তিনি আর্কটিক অঞ্চলে অনুসন্ধানের জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘এটা পেতে হলে ২৫ ফুট বরফ ভেদ করে নিচে নামতে হয়। এটা এমন কিছু নয় যা অনেক মানুষ করতে চায় বা করবে।’
তবুও, দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি বিষয় হয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ভূরাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রাখার পাশাপাশি, বিরল খনিজ শিল্পে চীনের আধিপত্য মোকাবিলাকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক স্টিভেন ল্যামির মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের আগ্রহ ‘মূলত ওই সম্পদগুলোর ওপর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং চীনের প্রবেশ ঠেকানোর বিষয়েই কেন্দ্রীভূত।’
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছিল। ২০২০ সালে দ্বীপটির রাজধানী নুকে মার্কিন কনস্যুলেট পুনরায় খোলা হয়, যা আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়।
ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তার মিত্ররা দ্বীপটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলছেন। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে নতুন সমুদ্রপথ খুলছে, পাশাপাশি মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ; অনুসন্ধানের সুযোগ বাড়ছে, যেগুলোকে প্রশাসন প্রতিরক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকার খাত হিসেবে দেখছে।
গত বছর গ্রিনল্যান্ডে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে, তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমানে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ‘এটা শিপিং লেনের বিষয়। এটা জ্বালানির বিষয়। এটা মৎস্য সম্পদের বিষয়। আর অবশ্যই, এটা আপনার মিশনের বিষয়—আমাদের নিরাপদ রাখা, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ, আমাদের প্রতিপক্ষদের নজরদারি করা এবং নিশ্চিত করা যে আমেরিকান জনগণ প্রতিদিন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে।’
গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন কোম্পানির খনন প্রকল্পে সমর্থনের সম্ভাবনা অনুমোদন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মাধ্যমে এ জন্য ১২০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯০ মিলিয়ন পাউন্ড) অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়।
এই পরিকল্পনা অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে, পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা অন্যান্য চুক্তির ধারাবাহিকতা—যার উদ্দেশ্য বিরল খনিজের সরবরাহ ও উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। বর্তমানে এই শিল্পে চীনের আধিপত্য রয়েছে।
বর্তমানে দ্বীপটির ১০০টি ব্লকে অনুসন্ধান অনুমতি দেওয়া হলেও, কার্যকরভাবে উৎপাদনশীল খনি রয়েছে মাত্র দুটি।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আর্কটিক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জেনিফার স্পেন্স বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডে খননের ক্ষেত্রে সবকিছুই এখনো সম্ভাবনার স্তরেই রয়েছে। তবুও তার মতে দ্বীপটির কৌশলগত নৌপথের অবস্থান ও বিরল খনিজের মজুতই ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রধান কারণ।’ তিনি বলেন, ‘তার যুক্তি হলো, এখানে একটি জাতীয় নিরাপত্তা জরুরি বিষয় রয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস, বিষয়টি অনেক বেশি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত।’
…………………