নিউজ ডেস্ক
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
সাড়ে চুয়াল্লিশ বছর আগে যেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জিয়া উদ্যানে স্বামীর পাশেই শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকাল সাড়ে ৪টায় সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
এর আগে একইদিন বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে খালেদা জিয়ার জানাজা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ তাতে শরিক হোন।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের ইমামতিতে সম্পন্ন হয় খালেদা জিয়ার জানাজা। এতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ক‚টনীতিকরা অংশ নেন।
জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার কফিন কাঁধে তুলে নেন ইসলামি বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হককেও কাঁধে নিতে দেখা যায়। আপসহীন নেত্রীকে শেষ বিদায়ের এই মুহ‚র্তটি লাখো মানুষের হৃদয়ে শোকের আবহকে আরও ঘনীভ‚ত করে তোলে।
মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যার বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান।

Tareq with family by the grave of his mother
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা। অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় আপসহীন নেত্রী।
৪০ দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তাঁর মৃত্যুতে দেশে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। আর বিএনপির পক্ষ থেকে সাতদিনের শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজার আগে সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেওয়া হয় গুলশানে ছেলে তারেক রহমানের বাড়িতে। পরে জাতীয় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়ি বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। গাড়িবহরে একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বাদ জোহর খালেদা জিয়ার জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই সংসদ ভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ দলের সর্বস্তরের নেতারকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াত ইসলামীর শফিকুর রহমান, মিয়া গোলাম পরওয়ার, শামীম সাঈদী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে দেখা গেছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহও বিএনপি নেত্রীর জানাজায় অংশ নেন।
জানাজার আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান প্রয়াত মায়ের জন্য জন্য সবার কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, “আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আমি আজকে এখানে উপস্থিত সকল ভাইয়েরা এবং বোনেরা-যারা উপস্থিত আছেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করবো ইনশাআল্লাহ।
“একই সাথে উনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় উনার কোনো ব্যবহারে, উনার কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন। আল্লাহ তাআলা যাতে উনাকে বেহেশত দান করেন।”
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। এছাড়া চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভেনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নেন।
তারেক রহমানের কাছে ভারতের শোকবার্তা হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে তার কাছে ভারতের শোকবার্তা হস্তান্তর করেন দেশটির ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শোকবার্তা হস্তান্তর করেন জয়শঙ্কর। বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে এই তথ্য জানানো হয়।
পোস্টে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের মা’, ‘সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক’Ñস্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা পাঠিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে শোকবার্তা হস্তান্তর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
এর আগে এদিন দুপুর ১১টা ৫৫ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন জয়শঙ্কর। এদিন বিকেলেই তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে যান।
তারেকের সঙ্গে দেখা করে শোক জানান পাকিস্তানের স্পিকার : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় পৌঁছে তাঁর ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক। এ সময় তিনি পাকিস্তানের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন বলে বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, ‘৩১ ডিসেম্বর দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে সহমর্মিতা জানান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এর আগে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছান পাকিস্তানের স্পিকার। ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের কাউন্সেলর (প্রেস) মো. ফসিহ উল্লাহ খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বুধবার সকালে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার ঢাকায় এসে পৌঁছান।
খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা ও ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুঙ্গেলও ঢাকায় আসেন। তারাও তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে শোক প্রকাশ করেন।
তিন বাহিনীর গার্ড অব অনার : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান (গার্ড অব অনার) জানানো হয়। এরপর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
জানাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্তর্র্বতী সরকারের উপদেষ্টারা অংশ নেন। এ সময় তিন বাহিনীর প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি অংশ নেন ৩২টি দেশের রাষ্ট্রদূত।