লন্ডন প্রতিনিধি
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হৃদয়ে একাত্তরের ঘোষণাপত্র উপস্থাপনের সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ। ছবি-জাগো প্রহরী।
বাংলাদেশের সংবিধান, রাষ্ট্র কাঠামো এবং জনগণের সার্বভৌম অধিকারকে পাশ কাটিয়ে তথাকথিত জুলাই ঘোষণা বাস্তবায়নের মতলবে ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট আয়োজনের উদ্যোগকে অসাংবিধানিক, গণবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক ধারাবাহিক অপচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে লন্ডনভিত্তিক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম হৃদয়ে’৭১। গত ২৬ জানুয়ারি পূর্ব লন্ডনের একটি হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত “লন্ডন ঘোষণা” আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
হৃদয়ে একাত্তরের সার্বিক আয়োজনে ১৭-১৮ জানুয়ারি ভার্চুয়ালে অনুষ্ঠিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সহযোগী উদ্যোক্তা ছিল ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমক্র্যাটিক গভর্ন্যান্স (কানাডা), সাউথ এশিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোরাম (ব্রাসেল্স) এবং গ্লোবাল কোয়ালিশন ফর সেক্যুলার অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশ (ইউএসএ)। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ডাকসুর সাবেক সদস্য ও হৃদয়ে’৭১-এর আহ্বায়ক দেওয়ান গৌস সুলতান। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নেতা অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমেদ, রাজনৈতিক সংগঠক ও ব্যবসায়ী মতিউর রহমান মতিন, হৃদয়ে’৭১ এর সংগঠক আলিমুজ্জামান, সাংস্কৃতিক সংগঠক রাজনীতিবিদ মুজিবুর রহমান মনি, ছমিরুন চৌধুরী, কিটন শিকদার, ভিপি আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা, আবদুল অদুদ, রেজাউল হক চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী, সাংবাদিক মোরছালিন মিজান, চৌধুরী মুরাদ, আব্দুল বাছির, শহীদুল ইসলাম সাগর প্রমুখ।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন দেওয়ান গৌস সুলতান, অ্যাডভোকেট শাহ ফারুক আহমেদ এবং মতিউর রহমান মতিন। তারা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে “গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দেশকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকৌশলের মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারার বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। তাদের ভাষায়, “১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত গণভোট সংবিধানের বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিপজ্জনক পদক্ষেপ। এটি গণতন্ত্রের বিকল্প নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থগিত করার কৌশল।”
হৃদয়ে’৭১ স্পষ্টভাবে জানায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয় গণভোটের নামে জাতিকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পুনর্গঠন কার্যত গণতন্ত্র স্থগিত করার সামিল।
লন্ডন ঘোষণার বিকল্প রূপরেখা : ১. ১৯৭২ সালের সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ২. নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ৩. আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ৪. মব সহিংসতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ৫. নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের দাবি আদায়ের অভিপ্রায়ে ১৭-১৮ জানুয়ারি লন্ডনকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রকর্মী, গবেষক ও নাগরিক সমাজ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে এই “লন্ডন ঘোষণা” গৃহীত হয়। হৃদয়ে’৭১ আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক শক্তি, মানবাধিকার সংগঠন এবং রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশে সাংবিধানিক শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আয়োজকরা বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশটি বর্তমানে উগ্রগোষ্ঠী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির দখলে চলে যাচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। তারা বলেন, দেশে প্রতিদিন মব ভায়োলেন্স, খুন, ডাকাতি ও অরাজকতা বেড়ে চলেছে। পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দেশছাড়া করার অপচেষ্টা চলছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে তারা বর্তমান সরকারের অধীনে যেকোনো নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানান। তারা বলেন, এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিলেও প্রকৃত ক্ষমতা যাবে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের হাতে, যা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা জোর দিয়ে আরো বলেন, এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ‘লন্ডন ঘোষণা’র আলোকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা।