বিএনপির নেতৃবৃন্দকে অবাক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ম্যাজিক

ড. খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করায় নানান গুঞ্জন-গুজব

বিশেষ সংবাদদাতা

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ড. খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করায় নানান গুঞ্জন-গুজব

FM Dr. Khalilur Rahman

ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেনকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে ২০১৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিল। আর এবার বিএনপি সরকার আরেক মার্কিন নাগরিককে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিল। সুতরাং আশা করা যায় আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মজবুত হবে। তবে একতরফা ও বহুল বিতর্কিত নির্বাচনে তারেক রহমান একচ্ছত্র আধিপত্যের বিজয় লাভের পরও কেন নানাভাবে বিতর্কিত-সমালোচিত (খোদ বিএনপি থেকেই যাকে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি উঠেছিল) খলিলুর রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নেয়া হলো তা নিয়ে সচেতন প্রবাসীদের মধ্যে গুজব-গুঞ্জনের ঝড় বইছে। বলা হচ্ছে, ইউনূসের আমলে দেশ-বিরোধী যত চুক্তি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতেই ইউনূসের পরামর্শে খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। আর এভাবেই তারেকের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগ কমবে। আবার এমনও বলা হচ্ছে যে, খলিলকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে ড. ইউনূসের সব অপকর্ম ঢাকা সম্ভব হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্সে আশ্রয়প্রাপ্ত বাংলাদেশি ব্লগার পিনাকি ভট্টাচার্যের সুপারিশে ড. খলিলুর রহমানকে প্রথমত রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ এবং পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। তখন অনেক বিএনপি নেতা তিনি মার্কিন নাগরিক বিধায় তাকে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়ায় তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীও একই আওয়াজ তুলেছিলেন। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড. খলিলুর রহমানকে টেকনোক্রেট হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। তাতে অনেকেই আশ্বর্য হয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন যে, ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে ভারত সরকারের সুপারিশে। আবার কেউ কেউ বলছেন, তাকে বিএনপি সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে এ পদে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ড. খলিলুর সম্প্রতি তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন যা এখনো গোপনীয় এবং এ সমস্ত চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত হয় সেজন্য তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তিনি একজন সুচতুর ব্যক্তি যিনি বিভিন্নভাবে বহু ধরনের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে পরিপক্ক। আন্ডারগ্রেড ডিগ্রি না করেই ভুয়া সার্টিফিকেটের মাধ্যমে তিনি তার স্ত্রীকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জনে সফলকাম হন। তিনি মাত্র দুই বছরে বস্টনের ট্রাফট থেকে এমএ এবং পিএইচডি অর্জন করেন। এগুলো সবই অবাক করার মতো। তিনি আসলে একজন ম্যাজিক ম্যান!

ড. খলিলুর যখন রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ নিয়োজিত হন তখন তিনি জাতিকে চমক দেখান এবং বলেন যে, অল্পদিনের মধ্যেই এক লাখ আশি হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যাবে। তার আশ্বাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে ঘোষণা দেন যে আগামী ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে উদযাপন করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যদিও ঈদ আসছে আর যাচ্ছে তবে একজন রোহিঙ্গাও এখনো স্বদেশে ফিরে যেতে পারেনি এবং আদৌ তারা ফিরে যাবে কিনা তার নিশ্চয়তা দিন দিন কমছে। বরং ইউনূস সরকারের সময়ে আরো দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে এবং ইউনূস সরকার এদের অনেককেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিয়েছে। তাছাড়া ইউনূসের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রায় ৬৭, ০০০ রোহিঙ্গা যারা এখন সৌদী আরবে আছেন এবং যারা কোনো দিন বাংলাদেশে আসেননি, তারা সৌদীতে জন্ম নিয়েছেন এবং বড় হয়েছেন তাদেরও বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেয়া হবে।

মার্কিন সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শুরু থেকেই সহায়তা দিয়ে আসছে এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছে। ইউএন এজেন্সি এবং পশ্চিমা সরকারগুলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকদের মতো সকল সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য অনেকদিন থেকেই চাপ দিচ্ছে। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পীড়াপীড়িতে তারা অঙ্গীকার করেছিল যে এদের একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে তারা আমেরিকা, কানাডাসহ অন্যান্য দেশে আশ্রয় দিবে। এখন সেসব অঙ্গীকার তারা বেমালুম ভুলে গেছে। বরং মুক্তিকামী গেরিলা বাহিনী আরশা ও আরাকান আর্মিকে সহায়তা দেয়ার জন্য মানবিক করিডোর অনুমোদন দেয়ার অনুরোধ করলে ড. খলিল তাতে রাজি হন। মোদ্দাকথা এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের সব আশা আকাক্সক্ষা গুড়েবালি। ড. খলিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক। তিনি চাইলে এদের ফেরত পাঠাতে পারতেন কারণ মিয়ানমার সরকার এদের স্বদেশে ফেরত নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ২০২৪’র নির্বাচনের পর এদের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ তারা নিয়ে যেতে নীতিগতভাবে রাজি হয়। তবে বিদেশি সংস্থা এবং এনজিওগুলো তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার না দিলে না ফেরার জন্য রোহিঙ্গাদের পরোক্ষভাবে উৎসাহ দেয়। তার ফলে পাঠানো সম্ভব হয়নি। মোদ্দাকথা রোহিঙ্গারা চলে গেলে বিদেশি সংস্থাগুলোর এসব লাভজনক চাকরি চলে যাবে, সেজন্য তাদের ফেরত পাঠাতে সংস্থাগুলো নিজেরাই মূলত চায় না। তাছাড়া বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তারা যারা এসব কাজে নিয়োজিত তারাও রোহিঙ্গা থাকায় বড় অংকের বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পাচ্ছেন।

পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমার রাজ্যের আরাকান প্রদেশ নিয়ে এবং ভারত ও বাংলাদেশের কিছু ভ‚খন্ড নিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিল যাতে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। মিয়ানমার সরকার চীনের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ এবং রাশিয়ার সাথেও তাদের যোগাযোগ উত্তম। মার্কিন সরকার চীনের প্রভাব কমানোর জন্য অনেক দিন ধরে বিভিন্নভাবে কাজ করছে।

ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন এবং আশির দশকে বস্টনের ট্রাফ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অর্জন করেন। ডিগ্রি পাস করার পর তিনি বস্টন থেকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। স্বদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য বার বার তাগিদ আসলে তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ মিশন থেকে জাতিসংঘের জেনেভায় আনটাকডে চাকরি সংগ্রহ করেন। তিনি দরিদ্র দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা প্রদানে কাজ করেন। তিনি জাতিসংঘের চাকরির নিয়ম ভঙ্গ করে দুটো চাকরি একসাথে করায় অনেক দিন ওএসডি ছিলেন। পরবর্তীতে দরিদ্র দেশগুলো বা এলডিসি বিষয়ক কাজে তিনি নিযুক্ত হন এবং এর প্রধান ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক এবং একসময় বাংলাদেশ সরকারের জাতিসংঘে স্থায়ী মিশনে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা।

২০০১ সালে ড. খলিলুর রহমানের মামা শ্বশুর বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হলে তিনি তার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কথিত আছে যে, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৩/১৪ জন সিনিয়র সচিবদের তাৎক্ষণিক চাকরিতে বরখাস্ত করার পেছনে তার হাত ছিল। ওই তালিকা তিনিই করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব থাকাকালীন তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মহিলা সহকর্মীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ওই মহিলাকে তিনি নিউইয়র্ক মিশনে বদলি করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। ওই মহিলার স্বামী একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। ড. খলিলের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক জানার পর ওই ভদ্রলোক লজ্জায় তার স্ত্রীকে নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন এবং পরে তিনি নিজেও আত্মহত্যা করেন। পুলিশের তদন্ত যখন খলিলুর রহমানের দিকে আসতে থাকে তখন ড. খলিল তাড়াতাড়ি দেশ ছেড়ে পালিয়ে জেনেভাতে ফিরে যান। তবে জেনেভায় গিয়েও তিনি সমস্যায় পড়েন। কারণ জাতিসংঘের কোনো কর্মকর্তা একই সাথে দুটো চাকরি করতে পারেন না। তিনি জাতিসংঘ থেকে ছুটি না নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের একান্ত সচিব হন। সুতরাং আনটাকড তাকে কোনো দায়িত্ব দেয়নি। তখন তিনি জেনেভা থেকে নিউইয়র্কে ফিরে আসেন এবং অনেক দিন ওএসডি ছিলেন।

ওএসডি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন সাহেবের মাধ্যমে প্রথমে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকার তার ডেপুটেশনের সময়সীমা বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে তিনি তারেক জিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন।

জাতিসংঘ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি ব্লগার পিনাকি ভট্টাচার্যকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করতে থাকেন এবং পিনাকির ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন। পিনাকির সুপারিশে ড. ইউনূস তাকে প্রথমে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ এবং পরবর্তীতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। তাঁর পরিবারের সবাই মার্কিন নাগরিক এবং তিনি অত্যন্ত সুচতুর ব্যক্তি। তিনি বিভিন্ন চলচাতুরি করে সব সময়ই অনেক সুযোগ সুবিধা গ্রহণে ওস্তাদ।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Default Advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১