দীপক কুমার আচার্য
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Bangabhaban
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার দেশটির রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকতে পারে। সাক্ষাৎকারে তাঁর অভিযোগ, তাঁকে কার্যত বন্দি রাখা হয়েছিল, বিদেশ সফরে বাধা দেওয়া হয়েছিল, বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক মিশন থেকে তাঁর ছবি নামানো হয়েছিল এবং এমনকি অসাংবিধানিক উপায়ে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। প্রশ্ন এখন আরও তীক্ষ্ণ: এটি কি কেবল রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নাকি একটি সম্ভাব্য সাংবিধানিক ক্যুর ইঙ্গিত?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। ৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তিনি রাষ্ট্রের অন্যান্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের একমাত্র সাংবিধানিক পথ হলো সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন (অনুচ্ছেদ-৫২) বা শারীরিক/মানসিক অক্ষমতার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। অতএব, কোনো অন্তর্র্বর্তী সরকার বা উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষে প্রশাসনিক নির্দেশে, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে কিংবা বিকল্প ব্যক্তিকে বসানোর পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে যদি সত্যিই এমন পরিকল্পনা হয়ে থাকে যে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির আসনে বসানো হবেÑতবে সেটি ৫৪ অনুচ্ছেদের অপব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার অতিক্রম হিসেবে গণ্য হতে পারে।
‘সাংবিধানিক ক্যু’ বলতে বোঝায়, সংবিধানের ভাষা বা প্রশাসনিক ক্ষমতার আড়ালে থেকে প্রকৃত সাংবিধানিক ভারসাম্য ভেঙে ফেলা। যদি রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য বঙ্গভবন ঘেরাও ও ‘মব’ সৃষ্টি, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, প্রেস উইং বন্ধ, বিদেশ সফর রোধ, কূটনৈতিক মিশন থেকে ছবি অপসারণ-এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো: কোনো লিখিত গেজেট নোটিফিকেশন বা সংসদীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা খর্ব করা আইনগতভাবে অবৈধ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানরা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে রাষ্ট্রপতির পরাজয় মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সুতরাং বাহিনীপ্রধানদের অবস্থান ছিল সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকারের অংশ। তবে এখানে সতর্কতা জরুরি, সামরিক বাহিনীর আনুগত্য ব্যক্তির প্রতি নয়, সংবিধানের প্রতি। যদি তারা কোনো অসাংবিধানিক পদক্ষেপ প্রতিরোধ করে থাকে, তবে তা সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বাহিনীর নাম জড়িয়ে পড়া গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিদেশে বাংলাদেশের মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি রাখা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অংশ। এটি ব্যক্তিগত সম্মান নয়; বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। যদি মৌখিক নির্দেশে বা ব্যক্তিগত ক্ষোভে সেই ছবি অপসারণ করা হয়ে থাকে, তবে তা হতে পারে সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ভঙ্গ, এমনকি দন্ডবিধির ১৬৬ ধারার আওতায় (সরকারি কর্মচারীর আইনবহির্ভূত কাজ) অপরাধ।
এ ধরনের নির্দেশ যদি প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, কসোভো ও কাতারের আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সফরে যেতে দেওয়া হয়নি, এমনকি তাঁর অজ্ঞাতে খসড়া চিঠি তৈরি করা হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর সরকারের পরামর্শক্রমে হয়। তবে রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া তাঁর নামে জবাব পাঠানো হলে তা হতে পারে জালিয়াতি-সংক্রান্ত অপরাধ (দন্ডবিধি ৪৬৩-৪৬৮ ধারা), ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি নথি বিকৃতকরণ। যদি এমন নথি প্রণয়ন ও প্রেরণ হয়ে থাকে, তবে তা তদন্তসাপেক্ষ গুরুতর ফৌজদারি বিষয়।
বঙ্গভবনের প্রেস উইং প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রপতির কণ্ঠরোধ করা হলে তা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় রাষ্ট্রপতিকে জনসমক্ষে অদৃশ্য করা, তবে তা হতে পারে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্নকরণ, ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশনের মাধ্যমে বিচারিক পর্যালোচনা সম্ভব ছিল বা এখনো হতে পারে।
বর্তমানে যদি সংশ্লিষ্ট সরকার ক্ষমতায় না থাকে তবুও আইন প্রয়োগের সুযোগ থাকে। সম্ভাব্য পদক্ষেপ: বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন। ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী মামলা। সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা। রাষ্ট্রদ্রোহ প্রযোজ্য হতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বা বলপ্রয়োগমূলক ষড়যন্ত্র প্রমাণের ওপর।
তবে মনে রাখতে হবে, “সাংবিধানিক ক্যু” একটি রাজনৈতিক ও আইনি ব্যাখ্যার বিষয়। আদালতে প্রমাণ ছাড়া এটি কেবল অভিযোগ হিসেবেই থাকবে। এই বিতর্কে ব্যক্তি ড. ইউনূস বা ব্যক্তি সাহাবুদ্দিনের চেয়ে বড় হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য। গণতন্ত্র টিকে থাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সে। যদি প্রশাসনিক কৌশলে রাষ্ট্রপতিকে পঙ্গু করা যায়, তবে ভবিষ্যতে যে কোনো রাষ্ট্রপতি একই ঝুঁকিতে পড়বেন। রাষ্ট্রপতি একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁকে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বানানো মানে সংবিধানের ভিত্তিকে নড়বড়ে করা।
যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর যদি প্রমাণিত না হয়, তবে এটি হবে রাজনৈতিক আখ্যানের অংশ। কিন্তু যেভাবেই হোক স্বচ্ছ তদন্ত, বিচারিক পর্যালোচনা ও জাতীয় সংলাপ এখন সময়ের দাবি। কারণ রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ব্যক্তিগত নয়, তা রাষ্ট্রের প্রতীকী ঐক্যের প্রতিফলন। বঙ্গভবনের দেয়ালে টানানো একটি ছবি নামানো হয়তো সামান্য ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু কখনো কখনো সেই ছবিই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আত্মার প্রতীক হয়ে ওঠে।