ঢাকা সংবাদদাতা
২৯ মার্চ ২০২৬
Lt Generals (Retired) Masud Chowdhury and Mamun Khaled
অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে প্রসিকিউশন। ২৯ মার্চ ট্রাইবুনাল-২ এ এই অভিযোগ দাখিল করা হয় বলে জানান প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
তামিম বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মামুন খালেদকে গুমের অভিযোগে এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জুলাই হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।”
এক-এগারোর আলোচিত সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত ২৩ মার্চ গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পল্টন থানার একটি মানব পাচার মামলায় আদালতে হাজির করে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ।
তকে একটি দুর্নীতি মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে দুদক। এছাড়া তার সম্পদের তথ্য তলবের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।
ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত।
বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা।
২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার দুদিন পর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি এক সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক ছিলেন।
পরে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার এক মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড পাঠায় আদালত।
ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ রয়েছে শেখ মামুনের বিরুদ্ধে। এক-এগারোর সময় তার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সিগন্যালস কোরের কর্মকর্তা হিসেবে শেখ মামুন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো-সিআইবির পরিচালকের দায়িত্ব পান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে শেখ মামুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন। প্রায় দেড় বছর তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
পরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) উপাচার্য এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে এই তিন তারকা জেনারেল।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রীসহ শেখ মামুন খালেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। তখন দুদক তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদসংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল।